গত কয়েক দিনে দেশের দুইটি ভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত দুইটি ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় পুলিশের সহিত একটি ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষ হইয়াছে। অন্যদিকে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চাঁদাবাজির অভিযোগে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের আটক ও কারাদণ্ডকে কেন্দ্র করিয়া ঘটিয়াছে থানা ভাঙচুরের ঘটনা। ইহাতে প্রমাণিত হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনগুলির মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি হইয়াছে। যাহা জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টির কারণ হইয়া দাঁড়াইতেছে।
জানা যায়, চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের উপর পুলিশের লাঠিপেটার অভিযোগ উঠে। ইহার জেরে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূরের অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৯ ঘণ্টা অবরোধ করিয়া রাখেন। এই দীর্ঘ অবরোধে সাধারণ যাত্রীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাইতে হইয়াছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ওসিকে প্রত্যাহার করা হইয়াছে, তবু আন্দোলনকারীরা বলিতেছেন, ইহা কেবল শুরু: তাহাদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করিতে হইবে।
ঘটনার সূত্রপাত হইয়াছিল নিষিদ্ধঘোষিত একটি ছাত্রসংগঠনের এক কর্মীকে আটকের পর পুলিশ কর্তৃক মামলা না নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া, যাহা পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। একই সময়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চাঁদাবাজির অভিযোগে একটি শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের দুই কর্মীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়ার পর থানা ঘেরাও করিয়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই হামলায় আট জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দাবি, ইজারাদারদের সহিত পুলিশের বিরোধকে তাহাদের দলের উপর চাপানো হইতেছে। তবে এমন অভিযোগও উঠিয়াছে যে, রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি এবং আইন হাতে তুলিয়া লওয়া হইতেছে। বাস্তবতা হইল-এইরূপ প্রবণতা সমাজে যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করিয়া থাকে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
সাম্প্রতিক কালে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেখা দিয়াছে। পত্রপত্রিকায় আমরা প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অঘটন বা নৃশংস খুনখারাবির খবর পাইতেছি। ইদানীং পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও হানাহানি ও খুনাখুনি বাড়িয়া গিয়াছে। যখন দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়, তখন এইরূপ সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। বিশেষ করিয়া উপর্যুক্ত দুইটি ঘটনায় একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষণীয়, তাহা হইল-আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠিলে বা তাহাদের কোনো পদক্ষেপ পছন্দ না হইলে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভদেখা দেয়। শুরু হয় অবরোধের মতো কঠিন কর্মসূচি। ক্ষেত্রবিশেষে সহিংসতাও দেখা দেয়। ইহাতে একদিকে যেমন 'রুল অব ল' বা আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি অন্যদিকে সাধারণ মানুষ জিম্মি হইয়া পড়ে। তাহাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা: কিন্তু তাহাদের বিরুদ্ধে যখন জনরোষ তৈরি হয়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সত্যিই কঠিন। আবার, রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠনগুলিরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করিয়া বা সহিংস পথ বাছিয়া লইয়া দাবি আদায়ের চেষ্টা কতটা যুক্তিসংগত তাহাও ভাবিয়া দেখা দরকার।
অন্যদিকে প্রশাসনের উচিত প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা। যদি কোনো পুলিশ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাহা হইলে তাহার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা লওয়া জরুরি। ইহার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলির উচিত তাহাদের কর্মীদের আইন মানিয়া চলিবার নির্দেশ দেওয়া এবং তাহাদের কেহ কোনো অন্যায় কাজে জড়িত থাকিলে তাহাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা সমাধানের মানসিকতা ছাড়া একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠা করা আদৌ সম্ভব নহে। এই সংকট নিরসনে সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল-সকলকে একসঙ্গে কাজ করিতে হইবে।
