কক্সবাজারে সমুদ্রস্নানের নিরাপত্তা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৫, ০৫:০০

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে চার বন্ধুর কক্সবাজার সমুদ্রস্নানে গিয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হইবার ঘটনাটি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। গতকালের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সাগরের ঢেউয়ের স্রোতে ভাসিয়া যাওয়া দুই জনের লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে। এক জন এখনো নিখোঁজ। এই দুঃসংবাদটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নহে, ইহা জাতির জন্য দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। কেননা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হইলেও দিনদিন এই সৈকত ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। ইহা আমাদের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির জন্যও অশনিসংকেতস্বরূপ।

উল্লেখ্য, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ১২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১১৭ কিলোমিটারই পর্যটকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মাত্র তিন কিলোমিটার সৈকতে লাইফ গার্ড থাকিলেও, তাহাদের সংখ্যা হাতেগোনা। ইহার ফলে কক্সবাজারে সাগরে ডুবিয়া পর্যটক মৃত্যুর ঘটনা দিনদিন বৃদ্ধি পাইতেছে। আরো দুঃখজনক ব্যাপার হইল, পর্যটকদের সমুদ্রস্নানের সময় পর্যটকরা সমুদ্রে ভাসিয়া গেলে তাহাদের উদ্ধারে নাই কোনো 'ডুবুরি দল'। নাই পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জামও। সমুদ্রস্নানে সতর্কতা হিসাবে কোনো কোনো স্থানে লাল পতাকা টাঙানো হইলেও তাহা মানেন না পর্যটকদের অনেকেই; কিন্তু শুধু লাল পাতাকা টাঙাইয়া দিয়াই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। এইখানে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

লাইফ গার্ড সংস্থার তথ্য মতে, গত ১০ বৎসরে সমুদ্রে গোসলে নামিয়া মৃত্যু হইয়াছে ৬১ জনের। আর জীবিত উদ্ধার করা হইয়াছে সহস্রাধিক। গত এক মাসেই মারা গিয়াছেন ছয় জন পর্যটক। সমুদ্রস্নানের সময় মৃত্যুর প্রধান কারণগুলির মধ্যে রহিয়াছে সমুদ্রের গুপ্তখাল, আকস্মিক জোয়ারভাটা এবং উত্তাল ঢেউয়ের বিপদ সম্পর্কে পর্যটকদের অজ্ঞতা ও অসতর্কতা। বিশেষত, হিমছড়ি সৈকতের ন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলিতে একাধিক গুপ্তখাল বিদ্যমান থাকে, যাহা খালি চোখে দেখা যায় না। সেইখানে ভিতরে এক শক্তিশালী টান সৃষ্টি করে। এই খালগুলিতে আটকা পড়িয়া অনেকে প্রাণ হারাইতেছেন। বিশেষত প্রতি বৎসর সাগরে ডুবিয়া মারা যাইতেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী। তাহাদের অনেকে আবার সাঁতার জানিত না। নদীমাতৃক বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সাঁতার জানিবেন না, ইহা কেমন কথা? সুকুমার রায়ের কবিতা অনুযায়ী সাঁতার না জানিলে আমাদের জীবন 'ষোল আনাই মিছে'। বিশেষ করিয়া বাংলাদেশের আধুনিক শহুরে জীবনে নদী বা পুকুরে সাঁতার কাটিবার সুযোগের অভাব এবং সাঁতার প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা ইহার অন্যতম কারণ। তাহা ছাড়া বর্ষাকালে লঘুচাপ ও ভাটার সময় সাগরে নামা কতটা বিপজ্জনক তাহা তাহাদের অধিকাংশই জানে না।

পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহেও সমুদ্রস্নানে দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সেইখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও জনসচেতনতা অনেক উন্নত। লাইফ গার্ডের উপস্থিতি, নির্দিষ্ট সাঁতার এলাকা চিহ্নিতকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সতর্কতা জারি এবং সাঁতার প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্বারোপের ফলে সেইখানে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রথমত, কক্সবাজারের ন্যায় জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে লাইফ গার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে হইবে এবং তাহাদের প্রশিক্ষণের মান উন্নত করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, পর্যটকদের মধ্যে সমুদ্রের বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। সৈকতের প্রবেশদ্বার ও বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসংকেত ও নিরাপত্তা নির্দেশনাসংবলিত ফলক স্থাপন করিতে হইবে। স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো উচিত। তৃতীয়ত, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সাগরে নামার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করিতে হইবে এবং এই নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। সর্বোপরি হিমছড়ি সৈকতের ন্যায় গুপ্তখালযুক্ত স্থানগুলি চিহ্নিত করিয়া সেইখানে কাঁটাতারের বেড়া অথবা অন্য কোনো উপায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করিতে হইবে এবং বিকল্প নিরাপদ সাঁতারের স্থান চিহ্নিত করিতে হইবে।

জীবন অমূল্য। তাই সাগরে মৃত্যুর ঘটনা যেন কক্সবাজারে নিয়মিত দুঃসংবাদে পরিণত না হয়, এই জন্য দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন