দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে এবং ১০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। নানা সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দিনদিন শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব নয়। তবে শিশুশ্রমে যুক্ত থাকা শিশুদের পরিবারকে শর্তযুক্ত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী চালু করলে শিশুশ্রমে যুক্ত থাকা শিশুরাও শিক্ষার আলো পাবেন। এজন্য দরকার সরকারসহ বেসরকারি সংস্থাসহ সবার এগিয়ে আসা।
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে চাইল্ড লেবার ইলিমিনেশন প্ল্যাটফর্ম (ক্ল্যাপ) আয়োজিত ‘শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গঠনে পথচলা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুজ্জামান ভুইয়া। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের শিশুশ্রম পরিস্থিতি এবং শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের নীতিমালা ও যেসব নীতিমালা হাতে নিলে এই সমস্যা থেকে আমরা উত্তরণ হতে পারবো সে বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, বিগত সময়ে কতজন শিশু শ্রমে যুক্ত সেই প্রকৃত তথ্য আমরা পাইনি। আমরা অসত্য তথ্য পেতাম এবং বাইরে প্রকৃত তথ্য গোপন করতাম। আশাকরি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকৃত তথ্য দিয়ে শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করে যাবেন। আমরা যাকাতের অর্থ দিয়ে এসব শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করতে পারি। যারা সমাজের অর্থশালী তারাও এসব শিশুদের দায়িত্ব নিতে পারেন। আমরা বাংলাদেশ থেকে শিশুশ্রম নিরসনে একসঙ্গে কাজ করে যাব।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত যে আমাদের ৩৫ লক্ষ শিশু এবং ১০ লক্ষ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে। সরকারের এককভাবে শিশু নিরসন সম্ভব না, কোনো সংস্থাও এককভাবে এটা নিরসন করতে পারবে না, এটা সামষ্টিক কাজ। আমাদের গৃহকর্মী কোন আদালতে তার অধিকারের জন্য যাবে? শ্রম আইন–২০০৬ আমরা সংশোধন করছি, আমরা শেষ মুহূর্তে আছি। আমরা শীঘ্রই জাতির কাছে একটি শ্রম আইন উপহার দেব যেটা হবে আন্তর্জাতিক মানের। আমাদের শ্রম আইনে বলা আছে গৃহকর্মীরা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হন না—আমরা এটা উঠিয়ে দিতে চাচ্ছি। আমাদের সংশোধিত আইনে গৃহকর্মীরা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হবেন।
তিনি বলেন, দেশে ১৪২টা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে তবে আমার ৭৫ মিলিয়ন শ্রমিকদের জন্য একটাও নেই। পেটের জন্য যে মা তার শিশুকে শ্রমে দিয়েছে তাদের আমরা কিভাবে জরিমানা করবো? তাদের কি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর অধীনে এই রকম প্যাকেজের আওতায় আনা উচিত না? এটা কি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে না?
৩৫ লক্ষ মাকে যদি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে আনি, আর মাকে শর্ত দেই যে শিশুকে শ্রমে যুক্ত করা যাবে না তাহলে শিশুশ্রম কমে যাবে—আমরা কি এটা পারি না?। আমরা আরও তিনটা আন্তর্জাতিক কনভেনশন স্বাক্ষর করে যুক্ত হতে চাচ্ছি যেগুলো শিশুশ্রম সম্পর্কিত। আমাদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুরা থাকতে চায় না। কেন থাকতে চায় না—এটা নিয়ে কি আমরা ভেবেছি? উন্নয়নের স্বপ্ন যা-ই দেখি, আমরা যদি শিশুদের বাইরে রেখে দেখি, তা হবে না।
অনুষ্ঠানে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। আমরা মূল প্রস্তাবনা দিয়েছি—সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সার্বজনীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রম নিরসনে নেওয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে আমরা শ্বেতপত্র চাচ্ছি। আমাদের এত প্রকল্প নেওয়ার পরেও কেন শিশুশ্রম বেড়েছে—তা খুঁজে দেখতে হবে। আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে, এএসডি, কারিতাস বাংলাদেশ ও এডুকো বাংলাদেশ থেকে আগত শিশুরা সরকারের কাছে তাদের পরিস্থিতি ও সরকার যেন তাদের সহযোগিতা করে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে পারে—তার দাবি জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে, এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আব্দুল হামিদ, ব্যবস্থাপক আফজাল কবির খান, চাইল্ড লেভার মনিটরিং কাউন্সিলের কো-চেয়ার এডভোকেট সালমা আলী, এনসিসিডব্লিউই এর সদস্য নাইমুল আহসান জুয়েল, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বাংলাদেশ এর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সৈয়দা মুনিরা সুলতানা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর সরকারি ও বেসরকারি সকল অংশীজনের সমন্বয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে সকল ধরণের শিশুশ্রম নির্মূল করার লক্ষ্যে ২১টি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে যাত্রা শুরু করে চাইল্ড লেবার ইলিমিনেশন প্লাটফর্ম (ক্ল্যাপ)।

