চে গুয়েভারা আমাদের যাহা বলিয়া গিয়াছেন-

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৫, ০৫:৫৯

পৃথিবীর সকল সমাজেই নানান সময় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। মূলত যেই ব্যবস্থায় একটি সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালিত হইতে থাকে, তাহাতে যদি শাসকের অহমবোধ তীব্রতর হয় এবং বৃহত্তর জনকল্যাণে ঘাটতি দেখা যায়, তবে সেই ব্যবস্থা ভাঙিবার চোরাস্রোত তৈরি হইবেই। কিন্তু যাহার জন্য ভাঙা হইল, পরিবর্তনের পর যদি তাহা গড়িয়া তোলা না হয়, তাহা হইলে সেই পরিবর্তন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়া যায়। ইতিহাস তাহাই বলে। অথচ প্রত্যেক পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মনে এক অনাঘ্রাত অপূর্ব আশার সঞ্চার করে।

মানুষ ভাবে-এইবার বুঝি তাহার জীবনের অন্ধকার বিদূরিত হইবে, নূতন সূর্য উঠিবে, দুর্ভোগ কমিবে, ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হইবে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই সকল পরিবর্তনের পর শাসক বদলায়, কিন্তু শাসনের চরিত্র বদলায় না। সাধারণ মানুষ পরে বুঝিতে পারে, তাহাদের ভাগ্যে কেবল 'ত্যাগ' রহিল, কিন্তু 'ফল' রহিল না। সুতরাং, বিপ্লব, বিদ্রোহ কিংবা গণঅভ্যুত্থান, যেইভাবেই পরিবর্তন হউক না কেন, পরিবর্তন যদি অর্থবহ না হয়, তাহা হইলে অসংখ্য মানুষের রক্ত ও ত্যাগ-তিতিক্ষা বৃথা হইয়া যায়। তখন বলিতে হয়, 'আমার জনম গেল বৃথা কাজে'।

আমরা এইখানে দেখিতে পাই, প্রতিটি পরিবর্তনের ফ্রেম একই ফরম্যাটে বাঁধাই করা, আর তাহা হইল-পূর্ববর্তী সকলেই ছিল খারাপ এবং পরিবর্তনের পর পরিবর্তন যখন আসিতেই থাকে, তখন যে-কাহারো মনে প্রশ্ন জাগিবে-তাহা হইলে ইহার শেষ কোথায়? যেই কারণে পরিবর্তন হয় এবং পুনরায় আবার যখন পরিবর্তন হয়, এবং ইহা যখন চলিতেই থাকে, তখন যেন একটা প্যাঁচকাটা চক্রে আটকাইয়া যায় দেশ ও সমাজ। প্রশ্ন জাগে, তাহা হইলে যেই কারণে পরিবর্তন, তাহাকে ফলপ্রসূ করিবে কে? অতীতের পরিবর্তন ফলপ্রসূ হইলে পরবর্তী পরিবর্তনের তো দরকার হইত না। বস্তুত, ইতিহাস যাহা শেখায়, তাহা বেশির ভাগ সময় আমাদের শেখা হয় না। এই জন্য পরিবর্তনের পর আবার পরিবর্তন, অতঃপর তাহারও পরবর্তী আরেক পরিবর্তন। এইভাবে চলিতে চলিতে কালের গর্ভে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বহু দেশ, সমাজ ও সভ্যতা।

এইখানে স্মরণীয় হইয়া উঠেন বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী চে গুয়েভারা। কিউবার বিপ্লব সফল হইবার পর তিনি নিজেই শাসনের কেন্দ্র হইতে নিজেকে প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছিলেন। তিনি দায়িত্বে ছিলেন, সম্মানিতও ছিলেন-কিন্তু তিনি বিশ্বাস করিতেন, বিপ্লবীর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হইল যেইখানে শোষণ বিদ্যমান, সেইখানে। তাহার জন্য তিনি কঙ্গোতে গেলেন, তাহার পর বলিভিয়ায় এবং অবশেষে প্রাণ দিলেন শোষিত মানুষের মুক্তির যুদ্ধে। ১৯৬৫ সালে তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে এই ব্যাপারে যাহা লিখিয়াছিলেন, তাহার মর্মার্থ হইল, 'এই ক্ষমতায় আমি নিজেকে যুক্ত করিতে চাই না। আমি বরং সেইখানে নিজেকে যুক্ত করিতে চাই, যেই জনপদে বিপ্লব প্রয়োজন।'

চে গুয়েভারার জীবনের এই পর্ব আমাদের সামনে এক গূঢ় প্রশ্ন তুলিয়া ধরে-পরিবর্তনের পর ক্ষমতার আসনে বসিলে কি পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়? যাহাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে, তাহারা কি ক্ষমতাসীন হইবার পর শুনিতে পান-তাহাদের লইয়া বৃহত্তর জনমানসে কী ধারণা তৈরি হইতেছে? তাহাদের লইয়া কী আলোচনা হইতেছে?

মুশকিল হইল, ক্ষমতার উত্তাপে থাকিলে সেই উত্তাপের ওম লইতে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি ছুটিয়া আসে। এই মৌমাছিরা একটি বিভ্রম ও ধোঁয়াশার বলয় তৈরি করে। ইহারা এমন একটি বলয় তৈরি করে, যাহাতে ক্ষমতাবানরা মনে করেন, তাহারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইহা সকল জামানায় সকল সময় সত্য। দুঃখজনকভাবে পরিবর্তনকারীরা ভুলিয়া যান, তাহারা কী উদ্দেশে এবং কেন পরিবর্তন আনিয়াছেন। কিন্তু ইহা ভুলিয়া গেলে একটি সময় আসিয়া তাহারাও রাস্তা পাইবেন না। সুতরাং পরিবর্তনের প্রকৃত ফসল দিতে হইবে, নচেৎ জনমানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগ বৃথা যাইবে। চে গুয়েভারার দর্শন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-শুধু শাসনক্ষমতা দখলের নাম বিপ্লব নহে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন