ইংরেজ লেখক ও রাজনীতিক টনি রবিনসনের 'কিংস অ্যান্ড কুইন্স' শিরোনামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রহিয়াছে, যেইখানে তিনি দেখাইয়াছেন-আজকের ইংল্যান্ড কী করিয়া 'আইনকানুনের মধ্য দিয়া' একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া উঠিল। সেইখানে তিনি লিখিয়াছেন, অষ্টম শতাব্দীতে ইংল্যান্ড নয়-দশটি ভাগে বিভক্ত ছিল, সেই সকল ভাগে শাসন করিত বিভিন্ন উপজাতির শীর্ষনেতারা। আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ তথা সুইডেন-নরওয়ে হইতে ভাইকিং জলদস্যুরা নর্থ সি পাড়ি দিয়া প্রায়শই আক্রমণ চালাইত বহুধাবিভক্ত ইংল্যান্ডে। এইভাবে চলিতে থাকিল ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ অবধি। অতঃপর ইংল্যান্ডের প্রথম সর্বজনস্বীকৃত রাজা 'আলফ্রেড দ্য গ্রেট' (শাসনকাল ৮৭১-৮৯৯ খ্রি.) ইংল্যান্ডকে একটি বিশেষ আইনের মধ্যে আনিলেন। তিনি সেইখানে যেই 'কিংডম' তৈরি করিলেন সেই রাজ্যে আনিলেন 'সকলের জন্য সমান আইন'-এর বিধান। সেই আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হইতে শুরু করিল মার্সিয়ান (ইংল্যান্ডের সাবেক কেন্দ্রীয় রাজ্য), নর্থামব্রিয়ান (তৎকালীন উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডবাসী), সাক্সন, এমনকি ভাইকিংদের ক্ষেত্রেও।
বলা হইয়া থাকে মহামতি আলফ্রেড 'সকলের জন্য সমান আইন'-এর মাধ্যমে তৎকালীন ইংল্যান্ডের জন্য একটি মহৎ 'আইডিয়া' আবিষ্কার করিলেন। অতঃপর, আইনের শাসন কাহাকে বলে, ক্রমশ তাহার ইতিহাস তৈরি হইতে থাকিল। তিনি প্রমাণ করিলেন-বলপ্রয়োগে নহে, বরং ন্যায়ের মাধ্যমেই প্রকৃত শাসনের ভিত্তি নির্মাণ করিতে হয়। তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন, একটি জাতিকে একসূত্রে গাঁথিবার সর্বাধিক শক্তিশালী উপাদান হইল 'সমান আইনের শাসন'। এই জন্য তিনি শুধু অ্যাংলো-স্যাক্সন সম্প্রদায় নহে, বরং মার্সিয়ান, নর্থাম্ব্রিয়ান, এমনকি শত্রু ভাইকিংদের প্রতিও ন্যায়বিচার সমানভাবে প্রযোজ্য করিয়াছিলেন। আইন যে কেবল দমন-পীড়নের অস্ত্র নহে, বরং সমাজে শৃঙ্খলা, সমতা ও ন্যায়ের স্তম্ভ-ইহা তিনিই প্রথম স্পষ্টরূপে প্রতিপন্ন করেন। তাহার এই চিন্তা ইংল্যান্ডের পরবর্তী শাসনব্যবস্থায় মূল ভিত্তি রূপে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। আধুনিক ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থার সূত্রপাতের কেন্দ্রবিন্দু বলিয়া যাহা চিহ্নিত, তাহার প্রারম্ভেই রহিয়াছেন এই আলফ্রেড। এই জন্য অনেক ইতিহাসবিদ তাহাকে ইংল্যান্ডের 'প্রথম শিক্ষিত রাজা' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন, যিনি স্বয়ং গ্রিক ও ল্যাটিন গ্রন্থ অনুবাদে অংশ লইয়াছিলেন, শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগী হইয়াছিলেন এবং ধর্ম ও দর্শনের আলোকে রাষ্ট্রনীতিকে গড়িয়া তুলিতে সচেষ্ট ছিলেন
আলফ্রেড আমাদের শিখাইয়াছেন, রাষ্ট্র তখনই টিকিয়া থাকে, যখন তাহার ভিত্তি গঠিত হয় সমান ন্যায়বিচারে এবং আইন হইয়া উঠে এক সর্বজনীন নীতিকাঠামো-যাহা দুর্বল ও ক্ষমতাশালী উভয়ের উপরেই সমভাবে আরোপিত। আধুনিক সভ্যতায় আইন হইল সকলকে একসূত্রে গাঁথিবার সবচাইতে বড় শক্তি। আরো স্পষ্ট করিয়া বলিলে বলিতে হইবে যে, সকলের জন্য সমান আইনই, বিভক্তির মধ্যেও, সবচাইতে শক্তিশালী 'ঐক্য' তৈরি করিতে পারে। অন্যদিকে ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে বিনষ্ট হয় ঐক্য, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সুনীতি। সুতরাং আমাদের মনে রাখিতে হইবে, যখন কোথাও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, নিয়মকে পাশ কাটাইয়া চলা হয়-তখন সেইখানে ভাঙন ধরিতে থাকে। এমনিতেই তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে আজও 'আধাসামন্ততন্ত্র' প্রবল-যেইখানে ন্যায় নহে, প্রভাব-প্রতিপত্তিই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে; কিন্তু 'দায়িত্ব' এমন একটি বিষয়, যাহা খেয়ানত করা যায় না। এই জন্য নবি মুহাম্মদ (স.) ইহাকে চরম অন্যায় হিসাবে অভিহিত করিয়া বলিয়াছেন যে, আল্লাহ তাহার কোনো বান্দাকে যদি মানুষের জন্য দায়িত্বশীল হিসাবে নিযুক্ত করেন, অতঃপর সেই ব্যক্তি যদি তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব খেয়ানত করিয়া মৃত্যুবরণ করেন, তাহা হইলে তাহার জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করিয়া দেন।
অতএব, সকলের উচিত আত্মবিশ্লেষণ করা। যুগে যুগে যাহারা যথাযথ নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়াছেন, তাহারা প্রত্যেকেই পরবর্তী সময়ে সময় উপলব্ধি করিয়াছেন-এই দিন দিন না, আরো দিন আছে। সুতরাং, নিয়মের মধ্যে থাকিতেই হইবে। যথাযথ আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে ১২০০ বৎসর পূর্বে মহামতি আলফ্রেড আমাদের যাহা শিখাইয়া গিয়াছেন-তাহা ভুলিলে চলিবে না। তাহা ভুলিলে আমরা ক্রমশ আরো বিভক্ত ও দুর্বল হইতে থাকিব।
