‘ডিল অব দি সেঞ্চুরি’ : ফিলিস্তিনিরা কি মানবেন?

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ২১:০৩

ইসরাইলের তত্ত্বাবধানে (পশ্চাতে থেকে) ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির দুই নবিশ ‘শতাব্দীর চুক্তি/ডিল অব দি সেঞ্চুরি’র প্রচারে নেমেছেন। নবিশদের নাম : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জামাই জারেড কুশনার। পণ্যের বাজার : মূলত আরব দেশসমূহ, বিশেষ করে সৌদি আরব, র্জডান ও মিশর। কারণ এই তিন দেশ হয়তো-বা ‘ওল্ড টেস্টামেন্টের’ ‘দাঁতের বদলা দাঁত’-এর কায়দায় ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের জন্য ‘জমির বদলা জমি’র ব্যবস্থা করবে। যদি করে, তাহলে গাজা ও পশ্চিম কিনারার (ওয়েস্ট ব্যাংক) সব ফিলিস্তিনি ও ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ঝেঁটিয়ে ঐ তিন দেশের তিন ভূখণ্ডে পাঠানো হবে, এবং গাজা ও পশ্চিম কিনারা’কে ইসরাইলের সঙ্গে সংযোজনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। দাবি করা হচ্ছে যে ডিলটির আকার অবয়ব দেওয়ার সময় ’মেরুদণ্ডহীন’ ইউরোপ ও আরব জাতিগুলো সযত্ন দৃষ্টি রেখেছিল। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কি ফিলিস্তিনিদের ঘাড়ে তা চাপিয়ে দিতে পারবে?

প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-আরব-ইসরাইল জোট ডিলটিতে সম্মতি দিয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত রায়ের কার্ডটি যে ফিলিস্তিনিদের হাতে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বরাবরের মতো ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের মধ্যে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি থেকে শুরু করে সিরিয়াস বিভক্তি থাকলেও সবাই, এমনকি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আব্বাসও ইসরাইলি-মার্কিন ডিলটিকে প্রত্যাখ্যান করতে সম্মত হয়েছেন। সুতরাং, ‘ডিল অব দি সেঞ্চুরি’র টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে না বা নেই, কারণ ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৮ সালে যে মহা ভুলটি করেছিল সেই ভুল আবারও করতে চায় না, তারা তাদের ভূখণ্ডকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। মিশর ও জর্ডানের কোথায় কোথায় বিনিময়ের ভিত্তিতে টুকরো টুকরো জমি তারা পাবে—‘ডিল’ অনুযায়ী, তারা তাদের ভূখণ্ডকে সেইসব জমিজমার বিনিময়ে দিতে সম্মত নয়।

 ফিলিস্তিনি কর্তাব্যক্তিরা বলেন যে : আরে, ইসরাইল তো সেই ১৯৫৬ সালেই ‘ডিল অব দি সেঞ্চুরি’ নোঙর করেছিল, আর কেমন পরিপ্রেক্ষিতে তা কি আমরা জানি? পাক্কা ৯ দিন ধরে একচিলতে গাজায় এবং বিশেষ করে খান ইউনিস ও রাফাহেত অসামরিক ফিলিস্তিনি ও উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের ইসরাইলিরা নির্বিচার হত্যা করে। নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের দলবদ্ধভাবে (বাইবেলের অনুরূপ) ‘অ্যাকসোডাস’/অভিনিষ্ক্রমণের দিকে ঠেলে দেওয়া, এবং অতঃপর জনশূন্য গাজা’কে ইসরাইলের সঙ্গে সংযোজিত করা। ১৯৪৮ সালে আক্কা, হাইফা, ইয়াফা, সাফাদ, গ্যালিলিয়া, আল-লেদ, আল-রামালা, সাবলুস, আল-কুদস এবং বির এল-সাবে’তে ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনি-হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে, হত্যা থেকে রেহাই পেতে অনেক ফিলিস্তিনি গাজা’য় আশ্রয় নিয়েছিল। জিয়োনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন ১৯৫৬ সালে যা করতে পারেননি, ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু সেই অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করতে চাইছেন।

নেতানিয়াহুর আনন্দময় সময় যাচ্ছে এখন। আইনসভার নির্বাচনে চিরায়ত ডানপন্থিদের হারিয়ে দিয়ে তার চরম ডানপন্থি দল বিজয়ী হয়েছে। সরল বাংলায়, ইসরাইলি সমাজের বিরাট অংশ চরমপন্থার পথে রায় দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কি বোধোদয় হবে? তবে প্রেসিডেন্ট আব্বাসের বিশ্বাস যে ‘অসলো চুক্তি’র বাস্তবায়ন সম্ভব (১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উপস্থিতিতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চুক্তিটি ওয়াশিংটনে সই হয়েছিল)। আব্বাস ছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সবাই তাই সচেতন যে সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া অন্য আর কোনো পথ নেই। গাজার ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ‘সিনাই’-এর শেখ জোবায়েদ, রাফাহ্ ও আল-আরিশ ছেড়ে দিতে রাজি হলে মিসর ৬৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছে। একই উদ্দেশ্যে জর্ডান যদি পশ্চিম কিনারার (ওয়েস্ট ব্যাংকের জোন সি) আল-বাকারা ও আল-গামের  দিয়ে দেয় তো ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার পাবে। তদুপরি, মিশরের কাছ থেকে সৌদি আরব যে ‘তিরান’ ও ‘সানাফির’ নামক দুটো দ্বীপ কিনেছে, সেই দ্বীপ দুটোর কিছুটা অংশ (‘হাকল’ ও ‘মাগনা’) জর্ডানকে দিয়ে দেবে। যদিও সৌদিরা মিশরীয় দ্বীপ দুটোর মূল্য মিটিয়ে দিয়েছে; কিন্তু মিশরের এক কোর্ট সম্পত্তির হস্তান্তর স্থগিত রেখেছে এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যারা ফিলিস্তিনে থেকে যাবে, তাদের ‘জীবনযাত্রা সহজ করার জন্য’ মোটা অঙ্কের অর্থসাহায্য দেওয়া হবে। তাছাড়াও, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবানন যদি যার যার দেশে অবস্থানরত  ফিলিস্তিনিদেরকে এমনভাবে ‘ইনটেগরেট’ করে যে তারা আর কোনো দিন ফিলিস্তিনে ফিরে আসবে না, তাহলে এসব দেশও লোভনীয় পরিমাণ অর্থ সাহায্য পাবে।

কিন্তু ‘ডিল’টি সফল হবে কি? সব কয়টি দেশ কি মেনে নেবে? না। যেমন: লেবানন ও সিরিয়া ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ‘ইনটেগরেশনের’ মাধ্যমে যথাক্রমে লেবাননীয় ও সিরীয়তে রূপান্তরিত করতে রাজি হবে না বা অস্বীকার করবে। কারণ, লেবানন বা সিরিয়াতে টিনএজের ফিলিস্তিনিদের যখন জিগ্যেস করা হয়—বাবা, কোত্থেকে আসছ? তাদের তাত্ক্ষণিক উত্তর : আমি ‘হাইফা, ইয়াফা, নাবলুস, কুদ্স, সাফাদ...’ থেকে এসেছি। এমনকি তাদের জন্ম যদি লেবাননে বা সিরিয়াতেও হয়ে থাকে, তারা সবসময়ই বাপ-দাদার দেশের (যারা বলর্পূবক অভিবাসী হয়েছিল) অন্তর্ভুক্ত বলে নিজেদের পরিচয় দেয়। দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার তারা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ করেনি, নিজের যে বসতবাড়ি ছেড়ে আসতে তারা বাধ্য হয়েছিল, সেই বাড়ির তালার চাবি—তাদের স্বত্বাধীনতার প্রতীক হয়ে, দেওয়ালে ঝুলছে।

মিশর ও জর্ডানের অবস্থাও মোটেই অনুকূল নয়। ইজরাইলের জন্য সহজ ও সুবিধাজনক হবে বলে ‘জমির বদলা জমি’ ব্যবস্থায় রাজি হলে জনসমষ্টির রোষে পড়তে হবে, তারা বিদ্রোহ করে বসবে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের, বিশেষ করে সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, মিশর, গাজা—তাদের অর্থকরির নিদারুণ টানাটানি অবস্থা চলছে। ‘ডিল’ প্রমোশনের মূল হাতিয়ার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র তাই র্অথনৈতিকভাবে গলা টিপে ‘কাজ’ আদায়ে নেমেছে। মার্কিন বাহিনী তেল ও কৃষি সমৃদ্ধ সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাংশ দখল করে রেখেছে। সীমান্ত এলাকায় সিরিয়া-ইরাক বাণিজ্য বন্ধের জন্য আল-তানফ অবরুদ্ধ করেছে। একইভাবে, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ, পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি থেকে বিরত রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিশ্বাস যে, সিরিয়াকে আলোচনা-টেবিলে বসতে বাধ্য করতে এটিই সর্বোত্তম ব্যবস্থা; কিন্তু তাদের বিশ্বাস কী বাস্তবায়িত হবে? হবে না। বরং ফিলিস্তিন ইস্যু জাগ্রত থাকবে। দ্বিতীয়ত, জোরজার করে ‘ইনটেগরেশন’ করলে দেশের জনগোষ্ঠীর ভারসাম্যতা নষ্ট হবে এবং লেবাননের খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা বিপজ্জনকভাবে প্রান্তিক গোষ্ঠীতে পরিণত হবে। জর্ডানের অবস্থা তো আরো খারাপ। টাকার খুব দরকার; কিন্তু এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার গ্রহণ করলে রাজতন্ত্রও থাকবে না, দেশও থাকবে না। রাশিয়ার সঙ্গে মিশরের সামরিক চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে মার্কিন কর্তাব্যক্তিরা জেনারেল সিসিকে ‘ডিল’টি গেলানোর চেষ্টা করেছিলেন। মিশর অবশ্য ব্ল্যাকমেইলটির ধাক্কা সামলাতে পেরেছে। ২০০৬ সালে বুশ জুনিয়রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিত্সা রাইস যে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য/নিউ মিডল ইস্ট’ সৃষ্টির ঘোষণা করেছিলেন, সেটি নেতানিয়াহুর এই ‘ডিল অব দি সেঞ্চুরি’। এই ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ সৃষ্টির পদক্ষেপ হিসাবে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে, ২০০৬ সালে ইসরাইল হেজবুল্লাহ্র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, অর্ধেক পৃথিবী সিরিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হয় ও প্রক্সি সন্ত্রাসের মাধ্যমে ‘রেজিম চেইঞ্জ’-এর ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়।

n লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক

[email protected]