দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি অভিবাসীদের নিয়ে সংকটে পড়েছে ইউরোপ। এর একটাই কারণ— মধ্যপ্রাচ্যে সবসময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, আইএসএর উগ্রবাদী মনোভাব ইত্যাদি। এর মধ্যে অনেকেই নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে বা উন্নত জীবন গড়তে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপীয় সীমান্তে। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী যে মানবাধিকার সংস্থাগুলো আছে তারা বহুবার এসব সমস্যা সমাধানের জন্যে মতামত উপস্থাপন করলেও তাতে তেমন কোনো সাড়া মেলেনি। গতবছর এক হতদরিদ্র পরিবার পানিপথে সিরিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার সময় সাগরে ডুবে মারা যায়। তাদের সঙ্গেই ছিলো তাদের পাঁচ বছর বয়সী ফুটফুটে শিশু আইলান কুর্দি। সে সহ তার পরিবারের সবাই পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। সেই সঙ্গে আইলান কুর্দির মৃতদেহটি জোয়ারের পানিতে ভাসতে ভাসতে আছড়ে পড়েছিলো তুরস্ক উপকূলে। এই ঘটনাটি তখন সারাবিশ্বের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুটি যেন মুহূর্তেই সবার অন্ধ চোখ খুলে দেয়। সমালোচনার মুখে পড়ে তখন সেই লাখ লাখ অভিবাসী প্রার্থীর মধ্য থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাত্র দেড় লাখ অভিবাসী গ্রহণ করতে সম্মতি প্রকাশ করে। যেটা একেবারে যত্সামান্য। বিষয়টা অনেকটা সমুদ্র থেকে কয়েক ফোঁটা পানি নেয়ার মতো! ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমানোর জন্যে এখনো অনেক যুবক ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অবশ্য কেউ কেউ সফল হচ্ছে আবার কেউ কেউ এভাবে নিজের মূল্যবান জীবন নদীতে বা সাগরের বুকে বিলিয়ে দিচ্ছে। সিরিয়ার এই অন্তিম পরিস্থিতি তৈরির মূল কারণ শাসক বাশার আল আসাদের নিষ্ঠুরতা। বিদ্রোহীদের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে এটা একসময় প্রকট রূপ ধারণ করে। পরবর্তীকালে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। যে সিরিয়া আগে অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের জন্যে আশ্রয়দাতা ছিলো, তারাই আজ নিজ দেশে আশ্রয়হীন, অনিরাপদ! সুতরাং আমরা দেখেছি, ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তখন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে। যেটা স্বাভাবিক মাত্রাকে ছাড়িয়ে যায়। তাই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় অনেকেই অভিবাসি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। তারপর ইরাক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ফল অত্যন্ত খারাপ অনুভূতি দেয় পুরো বিশ্ববাসীকে। তখন ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইরাকে বাস্তুচ্যুত লোক ছিলো ৩০ লাখেরও বেশি। যতই দিন যাচ্ছে এর সংখ্যাটাও যেন জ্যামিতিকহারে আরো বাড়ছে।
বিশ্ববাসী আইলান কুুর্দির সেই মর্মান্তিক মৃত্যুর কাহিনি না ভুলতেই আরো একটা ঘটনা ঘটে গেল এই বছরে জুলাই মাসের শুরুতে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের আশায় হাজার হাজার মানুষ এখন মেক্সিকো সীমান্তে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ব্যাপারে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে, এই অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান কখনো বদলাবে না। তাই সব মহলেই মার্কিন অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ শুরু হয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের কাছ থেকে আবেদনের ছাড়পত্রের জন্যে অপেক্ষারত শরণার্থীদের মেক্সিকো সীমান্তে পাঠানো হয়। এই পদ্ধতিকে রিমেইন ইন মেক্সিকো বা মাইগ্রেন্ট প্রোটেকশন প্রোটোকলস বলা হয়। অপেক্ষারতদের মধ্যে সালভাদরের নাগরিক অস্কার আলবার্তো মার্তিনেজ রামিরেজও ছিলেন। তার সঙ্গে দুই বছরের সন্তান ভ্যালেরিয়াও ছিলো। কিন্তু টেক্সাস সীমান্তের কাছে মাতামোরাসে সে গত দুই মাস যাবত্ অপেক্ষায় ছিলো। সেখানে প্রচণ্ড গরমে সবার অবস্থা একেবারে বিপর্যস্ত হতে শুরু করে। চিকিত্সা এবং খাদ্যাভাবে বেশিরভাগ লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন অস্কার আলবার্তো মার্তিনেজ রামিরেজ সিদ্ধান্ত নেয় রিও গ্রান্ডে নদী পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্র যাবে। বড় স্বপ্ন নিয়ে সে নদীতে নেমে পড়ে। তাকে দেখে তার মেয়ে ভ্যালেরিয়াও পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে অস্কার আলবার্তো মার্তিনেজ রামিরেজ তার মেয়েকে কোলে নিয়ে সাঁতরাতে থাকে। পরবর্তীকালে স্রোতের কাছে হার মেনে খেই হারিয়ে ফেলে। তাদের সবার স্বপ্ন নদীর পানিতেই মিশে যায়। অবশেষে জোয়ারের পানিতে তাদের মৃতদেহ ভেসে আসে কূলে। তাদের দেহ কাদার মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মেয়েটি তার বাবার টি-শার্টের মধ্যে তখনো মাথা লুকিয়ে ছিলো। মেক্সিকান এক সাংবাদিকের তোলা সেই ছবিটি মুহূর্তের মধ্যেই যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তার পরেরদিন এক জরুরি বৈঠকে সেই অভিবাসীদের জন্যে ট্রাম্প প্রশাসন ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন দেয়। এই সমস্যা কারো একার পক্ষেও মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটু আন্তরিকতায় পারে অভিবাসন নীতি সম্পর্কিত সমস্যা দূর করতে। আমরা আর কখনোই চাই না পুনরায় এ রকম ঘটনার মুখোমুখি হতে। অভিবাসন সম্পর্কিত সকল সমস্যা সমাধানে একসময় আলোর দেখা মিলবে সেই প্রত্যাশা রইল।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
