এই বিপদের গুরুত্ব আমরা বুঝিতেছি না

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ০৩:৩৬

খাদ্য যেমন পুষ্টির বাহক, তেমনি উহার মধ্যেই লুকাইয়া থাকিতে পারে স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্ভাব্য উৎস। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হইয়াছে, বাংলাদেশের বাজারে বহুল প্রচলিত 'সোনালি' জাতের মুরগির মাংসে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ইশেরেশিয়া কোলাই বা ই কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি। ই কোলাই কেবল পরিচিত জীবাণু নহে, ইহা এমন এক ব্যাকটেরিয়া, যাহা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতায় সক্ষম। অর্থাৎ, ইহাকে প্রতিরোধ করিবার জন্য প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক অনেকাংশেই কার্যকর নহে। উক্ত গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, ৩৯০টি সোনালি মুরগির মাংসের নমুনার মধ্যে ৬৮ শতাংশে ই কোলাই উপস্থিত; ইহাদের মধ্যেও ৪০ শতাংশের অধিক নমুনা 'এক্সটেনডেড-স্পেকট্রাম বিটা-ল্যাকটামেজ' নামক উৎসেচক উৎপাদন তৈরি করিতে পারে। ইহাই মুরগির মাংসে সংক্রমিত ব্যাকটেরিয়াকে সেফালোস্পোরিন, পেনিসিলিন ইত্যাদি প্রধান অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধে সহায়তা করে।

গবেষণাটির গুরুত্ব এইখানে যে, উহা কেবল সংক্রমণের তথ্য দিতেছে না; ইহা বলিতেছে, কীভাবে মাংসের উৎস ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়ে ব্যাকটেরিয়া দেহে প্রবেশ করিবার পথ খুঁজিয়া পায়। মুরগির খাবার, অপরিচ্ছন্ন খামার পরিবেশ, এবং জবাই-পরবর্তী অপরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ এই ব্যাকটেরিয়া ছড়াইবার মূল মাধ্যম। বিশেষত, যদি খামারে মুরগির রোগের সামান্য লক্ষণেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয় এবং তাহা পশুচিকিৎসকের নির্দেশ ব্যতীত প্রয়োগ করা হয়; তাহা হইলে তাহা জীবাণুকে ধ্বংস না করিয়া উহাকে অধিক শক্তিশালী করিয়া তোলে। সমস্যা হইল, বাংলাদেশে পশু চিকিৎসা ক্ষেত্রে খামারিরা ভেটেরিনারি পরামর্শ ছাড়াই দোকানদারের মুখে শুনিয়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন। এমনকি কখনো কখনো পর্যাপ্ত মাত্রার নিচে ঔষধ প্রয়োগ করা হয়; যা ব্যাকটেরিয়াকে মারিয়া না ফেলিয়া তাহাদের টিকিয়া থাকিবার শক্তি বাড়াইয়া দেয়। এই ব্যাপারে উন্নত বিশ্বের দৃষ্টিকোণ হইতে আমাদের খামার ব্যবস্থাপনায়ও এখন 'ওয়ান হেলথ' ধারণা প্রয়োগ করা প্রয়োজন। উক্ত ধারণা অনুযায়ী, মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ-এই তিনের স্বাস্থ্য পরস্পর নির্ভরশীল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলিতেছেন, মানুষের অস্ত্রে সাধারণত ই কোলাই থাকে; কিন্তু তাহা যদি খাবারের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে ও চরম রূপ ধারণ করে, তখন তাহা গুরুতর রোগ সৃষ্টি করিতে পারে। বাংলাদেশে খাদ্যশৃঙ্খলও অ্যান্টিবায়োটিকের বিপজ্জনক চক্রে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও মাছের খামারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ হয় একটি নিয়মিত ও নির্বিচার প্রক্রিয়ায়-চিকিৎসার প্রয়োজনে নহে, বরং 'রোগ প্রতিরোধ' বা দ্রুত ওজন বৃদ্ধির সুবিধায়। এই অদৃশ্য ঔষধের ভগ্নাংশ মানুষের দেহে প্রবেশ করিতেছে মাংস, ডিম ও দুধের মাধ্যমে। ফলে, শিশু থেকে শুরু করিয়া বৃদ্ধ পর্যন্ত একটি সমগ্র প্রজন্ম অজান্তেই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উর্বর ভূমি হইয়া উঠিতেছে। এই 'সুপারবাগ' একসময় এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেইখানে মানুষের চিকিৎসায় কার্যকর কোনো ঔষধ থাকে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে রোগের বিস্তারে অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। একবার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া কোনো পয়ঃবর্জ্যের মাধ্যমে পানিতে ছড়াইয়া পড়িলে উহা বদ্ধ ডোবা, খাল, নদী কিংবা সেচব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিজমি, মাছের খামার এবং সর্বশেষ খাদ্যপণ্যে প্রবেশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে যদি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের লাগাম টানা না যায়, তাহা হইলে প্রতি বৎসর প্রায় ১ কোটি মানুষ এই কারণে প্রাণ হারাইতে পারে-তাহার বৃহৎ অংশই হইবে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশসমূহে।

এই ভয়াবহ বিপদের গুরুত্ব আমরা বুঝিতেছি না। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হইয়া উঠিবার এই নীরব বিপর্যয় সমগ্র বিশ্বেই স্বাস্থ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও তীব্র করিবে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির জন্য তাহা হইতে অতি ভয়ংকর। এই জন্য অদূর ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকহীন পৃথিবী হইবে এক নির্মম পৃথিবী। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে সতর্ক না হই, তাহা হইলে ভবিষ্যতের ইতিহাসে লেখা থাকিবে-মানবজাতি নিজের তৈরি ঔষধ দিয়াই গড়িয়া তুলিয়াছিল তাহার ধ্বংসের বীজ।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন