সরকার চলতি মাস থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করেছে। বহুল আলোচিত আইনটি কার্যকরের আগে থেকেই ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ থাকলেও বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে নতুন ভ্যাটে স্বস্তি মিলবে বলে আশ্বস্ত করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেই স্বস্তি মিলছে না। বরং কোন ব্যবসায়ীর ওপর কী হারে ভ্যাট আরোপ হবে, কারা ভ্যাটের আওতায় আসবে কিংবা আসবে না, এসব পরিমাপের মানদণ্ড কী হবে—তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এর মধ্যেই এনবিআর থেকে একের পর এক নতুন নতুন আদেশ জারি করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ১৮০ ধরনের উত্পাদনকারী ও ব্যবসাকে বাধ্যতামূলক ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার আদেশ জারি করে ভ্যাট বিভাগ। বাজেটে ৫০ লাখ টাকার নিচে বার্ষিক টার্নওভারের (বিক্রি) ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন আওতার বাইরে রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এই আদেশের ফলে অনেক ছোট স্বল্প বিক্রির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে মাসে মাসে ভ্যাট অফিসে রিটার্ন জমা দিতে হবে। অলিগলির অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও এনবিআরের নানা নিয়মের বাধ্যবাধকতায় আসতে হবে।
এসব কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাইপ অ্যান্ড টিউবওয়েল মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক সোলায়মান পারসী ফয়সাল ইত্তেফাককে বলেন, ভ্যাট নিয়ে কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক রয়েছে। আবার মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসাররাও জানেন না, কী হতে যাচ্ছে।
এদিকে, অনলাইনে ভ্যাট কার্যক্রম দেখভালের জন্য ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়নি বলে জানা গেছে। ব্যবসা পর্যায়ে ইএফডি মেশিন ব্যবহারের কথা বলা হলেও ক্রয়ের কার্যক্রমও সম্পন্ন করা যায়নি। এতেও কিছু জটিলতার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ৯ সংখ্যার ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন) নেওয়ার কথা থাকলেও সম্প্রতি তা ১৩ সংখ্যার নিতে হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। আবার যারা অতীতে বিআইএন নিয়েছেন, এমন ব্যবসায়ীদেরও চলতি মাসের মধ্যে ফের বিআইএন নিতে হবে বলে জানানো হয়েছে। এসব কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানিও বেড়েছে। প্রতিদিনই ভ্যাট অফিসগুলোতে ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিরা এসে এসব বিষয়ে জানতে নানাজনকে প্রশ্ন করছেন।
সূত্র জানিয়েছে, নতুন ভ্যাটের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এনবিআরকে চিঠি পাঠাচ্ছে। নতুন ভ্যাট আইনে ১২ ধরনের সমস্যা তুলে ধরে এনবিআরকে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ মোটর পার্টস ও টায়ার টিউব ব্যবসায়ী সমিতি। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, জুলাইয়ের রিটার্ন আগামী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হবে। তখন থেকেই সমস্যাগুলো পরিষ্কার হবে।
নতুন ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া কী হবে- এ ব্যাপারে পরিষ্কার নয় মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসগুলোও। সূত্র জানিয়েছে, ভ্যাট অফিসগুলো ব্যবসায়ীদের অনেক প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারছে না। তারাও বিভিন্ন বিষয়ে এনবিআরের সিদ্ধান্তের দিতে তাকিয়ে আছেন। কিছু সমস্যা তুলে ধরে এনবিআরকে অবহিত করছে মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসগুলোও।
নতুন ভ্যাট আইনে ১৫ শতাংশের একক হারের পরিবর্তে পাঁচ, সাড়ে সাত, দশ ও পনেরো শতাংশ ভ্যাট হার ধার্য করা হয়েছে। এর বাইরে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবায় দুই থেকে আড়াই শতাংশ হারেও ভ্যাট রয়েছে। এছাড়া, ব্যবসা ও সরবরাহ পর্যায়ে ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ক্ষেত্রে চার শতাংশ টার্নওভার ভ্যাট এবং ৩ কোটি টাকার ওপরে টার্নওভারের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হবে। যারা ভ্যাটের অব্যাহতি সীমার ওপরে থাকবেন, তাদের বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক হিসাব যন্ত্র বা ইএফডি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু কোন ব্যবসায়ীর বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার ওপরে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এ নিয়ে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন আদেশে ভ্যাটের অব্যাহতির আওতায় থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছোট ও মাঝারি আকারের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকান, পোশাক বিপণনকারী স্বল্প মূলধন ও অল্প বিক্রির দোকানও নিবন্ধনের তালিকায় চলে আসছে।
