বাংলাদেশের অভিনয়, নাটক নির্মাণ, বিজ্ঞাপন, চিত্রকলা— সবকিছুতেই নিজস্ব ছাপ রেখে যাওয়া এক গুণী মানুষ আফজাল হোসেন। আজ ১৯ জুলাই তার জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে তাকে নিয়ে কথা না বললেই নয়। যদিও তিনি প্রচারবিমুখ। খুব বেশি কথা বলেন না। তবে যখন বলেন, তা হয়ে ওঠে সময়ের দলিল। জন্মদিনে গুণী এই মানুষটির আলাপচারিতা নিয়ে এই প্রতিবেদন।
১৯৫৪ সালের ১৯ জুলাই সাতক্ষীরায় জন্ম আফজাল হোসেনের। শৈশব-কৈশোর কেটেছে খুলনা ও সাতক্ষীরায়। ছাত্রাবস্থায়ই মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে হাতেখড়ি। ১৯৭৫ সালে ‘বহুব্রীহি’ ও ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকের মাধ্যমে টেলিভিশনের পর্দায় তার যাত্রা শুরু। এরপর আশির দশকে হয়ে ওঠেন ছোট পর্দার অন্যতম রোমান্টিক নায়ক। তার অভিনয়ে ছিল সংলাপের সংযম, চোখের ভেতরের কথা বলার দক্ষতা, যা তাকে ভিন্নমাত্রার অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
তবে শুধুই অভিনয় নয়, নির্মাণেও রেখেছেন স্বকীয়তা। বিটিভির জন্য ‘এই শহরে’, ‘ত্রয়ী’, ‘আজ রবিবার’-এর মতো নাটক নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি বিজ্ঞাপন নির্মাণের জগতে এনেছেন নতুন ধারা। মজার বিষয়, প্রথম দিকে বিজ্ঞাপন নির্মাণ নিয়ে অনেকেই তাকে প্রশ্ন করেছেন, কেন অভিনয় ছেড়ে এই দিকে গেলেন? এই প্রসঙ্গে আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমি অভিনয়কে ছাড়িনি। বরং আমি যে কোনো মাধ্যমেই সৃজনশীলতার খোঁজ করি। অভিনয়, নির্মাণ, চিত্রকলা— সবকিছু মিলিয়ে জীবনটাই একটা শিল্প।’
জন্মদিন নিয়ে তার অনুভূতি প্রসঙ্গে আফজাল হোসেন বলেন, ‘খুব বেশি কিছু মনে হয় না। জন্মদিন নিয়ে কখনও খুব বাড়তি কিছু ভাবিনি। তবে এখন দেখি, দিনটা এলে মানুষ ফোন করে, শুভেচ্ছা জানায়। তখন ভালো লাগে। তবুও নিজের ভেতরে বলি— ‘সময়ের আরেকটা বছর পার হয়ে গেল। এখন নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নিতে হবে।’
এখনকার নাটক-সিনেমা নিয়ে তার ভাবনা প্রসঙ্গে আফজাল হোসেন বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে মাধ্যম বদলায়। আমাদের সময় নাটকের গল্প, অভিনয়— সবকিছু নিয়ে একটা নিরীক্ষা ছিল। এখন টেকনোলজি এসেছে। সেটা ভালো। তবে গল্প যদি মাটি থেকে উঠে না আসে, মানুষের কথা যদি না বলে— তাহলে সেটা ধরে রাখা কঠিন।’
আপনি তো চিত্রশিল্পীও, আপনার আঁকা নিয়ে কিছু বলুন— প্রশ্নের জবাবে এই গুণী শিল্পী বলেন, ‘ছবি আঁকাটা আমার কাছে নিভৃতে থাকার উপায়। মাঝে মাঝেই রাত জেগে আঁকি। নিজের ফেসবুকেও কয়েকটা পোস্ট করেছি। লিখেছিলাম— ‘এঁকেছি নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য।’ আসলে ছবি আঁকা আমার ধ্যানের জায়গা।’
জীবন নিয়ে আপনার মূল দর্শন কী? জানতে চাইলে আফজাল হোসেন বলেন, ‘নিজের ভেতরের মানুষটাকে ঠিক রাখা। এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। আর সেই কাজটাই সবচেয়ে জরুরি।’
ফেসবুক স্ট্যাটাসে দর্শনধর্মী লেখালেখি প্রসঙ্গে আফজাল হোসেন জানান, ‘ওগুলো আসলে নিজের সঙ্গে কথা বলা। সময়ের আয়না দেখা। শিল্পও তো তাই— নিজের সঙ্গে কথা বলার উপায়।’
ব্যক্তিগত জীবনে প্রচারবিমুখ এই শিল্পী দীর্ঘদিন ধরেই দূরে আছেন অভিনয়ের প্রধান স্রোত থেকে। তবে এখনও নিয়মিত আঁকেন, লেখেন, নির্মাণ করেন। তার ভাষ্যে, ‘নিজের কাজটাই বড় কথা। কে দেখল, কে দেখল না— সেটা মুখ্য নয়।’
আফজাল হোসেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতার নাম। তার জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে শিল্প-সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

