কক্ষের তালা ভেঙ্গে রেনুকে বের করে দেওয়া হয় গণপিটুনি

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ২২:১০

চার-পাঁচ জন নারী অভিভাবক তাসলিমা বেগম রেনুকে ছেলেধরা বলে আখ্যা দেওয়ার পর নিরাপত্তার জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ বেগম দোতলার একটি কক্ষে তাকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এরই মধ্যে নারী অভিভাবক আকলিমা স্কুলের সামনে গিয়ে চিত্কার করতে থাকেন যে, স্কুলে ছেলেধরা আটক করা হয়েছে। এতে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে স্কুলে প্রবেশ করে। হূদয় ছেলেধরাকে খুঁজতে থাকে। স্কুলের দোতলার কক্ষে গিয়ে সেসহ সাত/আট জন লোহার রড দিয়ে আঘাত করে তালা ভেঙে ফেলে। রেনুকে টেনে-হিঁচড়ে দোতলা থেকে স্কুলের সামনের কমপাউন্ডে নিয়ে আসে। এরপর রেনুকে তারা পেটাতে থাকে। স্কুলের দোতলার বারান্দায় প্রধান শিক্ষিকাসহ অন্য শিক্ষকগণ এই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। স্কুলের শিক্ষকরা কোনো বাধা দেননি। গত মঙ্গলবার রাতে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে হূদয় ডিবি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছে। ঘটনার দিন স্কুল গেটে থাকা এক নারীর চিত্কারে সে গণপিটুনিতে অংশ নেয় এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নামও বলেছে। আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।

বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ছেলেধরা চিত্কার করে মানুষ জড়ো করা ওই নারীকে আমরা শনাক্ত করেছি। তবে তিনি পুরো ঘটনা অস্বীকার করেছেন। তাকে আমরা নজরে রেখেছি। তার বিরুদ্ধে আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি। নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেফতার করা হবে।

গতকাল বুধবার বিকালে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক আসামি হূদয়কে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম হূদয়কে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদী পক্ষে ছিলেন মাইদুল ইসলাম পলক, জাহিদুল ইসলামসহ আরো অনেকে। তবে আসামি পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না।

গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন শাখায় এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হূদয় জানিয়েছে ঘটনার দিন রেনু স্কুলে প্রবেশ করার সময় গেটে থাকা অন্য এক নারী অভিভাবক তার পরিচয় এবং বাসার ঠিকানা জানতে চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেনু ঐ নারীকে তার নাম-ঠিকানা জানান। সে সময় ঐ নারী রেনুকে দেখিয়ে ছেলেধরা বলে চিত্কার করেন। এর মধ্যে রেনুকে স্কুলের একটি কক্ষে বন্দি করা হয়। এ সময় ছেলেধরার খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু কাছেই বাজার তাই মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ ভিড় জমায়। এদের মধ্যে উত্সুক কিছু মানুষ স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে রেনুকে বের করে পিটুনি দেয়। হূদয়ও তাদের সঙ্গে অংশ নেয়। তিনি বলেন, হূদয় স্কুলের পাশেই একটি দোকানে সবজি বিক্রি করত। সবজি বিক্রি শেষে সে স্কুলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। রেনুকে স্কুলে প্রবেশ করতেও দেখেছিল সে।

ডিবির এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ঘটনার পর হূদয় যখন বুঝতে পারে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবে তখন নারায়ণগঞ্জে পালিয়ে যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেনু এবং ওই নারী পূর্ব পরিচিত কি না সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। ঘটনাটি পরিকল্পিত কি না তা ওই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বলা যাবে। কারণ রেনুকে দেখে তিনিই প্রথম ‘ছেলেধরা’ বলে চিত্কার করেছিলেন।

তিনি আরো জানান, গ্রেফতার এড়াতে হূদয় মাথা ন্যাড়া করেছিল। এছাড়া তার সব কাপড় পুড়িয়েও ফেলতে বলে তার নানীকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এছাড়া সেসহ যারা রেনুকে তালা ভেঙে বের করে আনে, তাদের নাম বলেছে। আমরা তাদের দ্রুত গ্রেফতার করব।

উল্লেখ্য, গত শনিবার সকালে মেয়ে তুবাকে ভর্তি করার জন্য রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজখবর নিতে যান তাসলিমা বেগম রেনু। এ সময় তাকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের ভাগিনা নাসির উদ্দিন। এ ঘটনার হোতা হূদয়সহ মোট ৭ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। এদের মধ্যে জাফর নামে একজন গত সোমবার বিচারকের কাছে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।