“অভয়াশ্রম গড়ে তুলি, দেশী মাছে দেশ ভরি” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২২ থেকে ২৮ জুলাই দেশব্যাপী জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। দেশীয় মাছের সংরক্ষণ, চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধকরণসহ মৎস্য খাতের সম্ভাবনা, কর্মসূচী এবং উন্নয়ন সম্পর্কে জনগণকে অবহিতকরণ, মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে চলমান কার্যক্রমকে বেগবান করা এবং অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশীয় মাছের সংরক্ষণকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়াই এবারের মৎস্য সপ্তাহের মূল লক্ষ্য।
জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। ইন্সটিটিউট থেকে ইতোমধ্যে মৎস্য চাষ, পোনা উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ৮৭টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ মৎস্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থা এবং খামারী ও উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে সাম্প্রতিসময়ে দেশে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশীয় মাছ বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং পুষ্টিগুণ বিচারে দেশীয় মাছ পর্যাপ্ত আমিষ ও প্রচুর অনুপুষ্টিতে ভরপুর যা সুস্থ ও স্বাভাবিক দেহ গঠনে এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও, দেশীয় ছোট মাছে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, ভিটামিন এ, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম রয়েছে এবং মাছ হতে প্রাপ্ত ফ্যাট হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। দেশের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দেশীয় মাছের সঠিক সংরক্ষণ ও প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন করা অতীব জরুরী।
আমাদের মিঠাপানির জলাশয়ে ২৬১ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩টি ছোট প্রজাতির মাছ। জলবায়ুর পরিবর্তন, অতি-আহরণ, কৃষিকাজে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার ও পানি দূষণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে এসব দেশীয় মাছ যেমন পাবদা, গুলশা, মেনি, টেংরা, খলিসা, মলা, ঢেলা ও রাণী ইত্যাদি একসময় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
আইইউসিএন (২০১৫) এর তথ্য মতে ৬৪ প্রজাতির মাছ বিপন্নের তালিকায় রয়েছে। এসকল বিপন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের সংরক্ষণ, প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি উদ্যোগ। ইন্সটিটিউটে সকল বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিসহ ও দেশীয় মাছের জীনপুল সংরক্ষণ ও মৎস্য জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গবেষণা পরিচালনা করে ইতোমধ্যে ৪১টি বিপন্ন প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করেছে। এরমধ্যে চিতল, ফলি, টেংরা, গুতুম, খলিশা, আঙ্গুশ, বাতাসি, পিয়ালী, শোল, তিঁতপুটি, শালবাইম, জারূয়া এবং গোটালি অন্যতম। উদ্ভাবিত এসব মাছের চাষ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে চাষের মাধ্যমে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন ০৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২.৭১ লক্ষ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে হারিয়ে যাওয়া দেশীয় ছোট মাছের প্রাপ্যতা সাম্প্রতিককালে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে দেশের পাঁচ শতাধিক হ্যাচারিতে দেশীয় ছোট মাছের পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে। দেশীয় এসব মাছের প্রজনন, চাষাবাদ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ৫ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ও তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এছাড়াও, দেশীয় মাছের উপর ইন্সটিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণার ফলাফল সন্নিবেশিত করে ‘দেশীয় মাছের প্রজনন ও চাষ প্রযুক্তি’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে যা বিপন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ইন্সটিটিউট হতে মিঠাপানির দেশীয় মাছের জীনপুল সংরক্ষণে ইতোমধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ইন্সটিটিউটের ময়মনসিংহস্থ স্বাদুপানি কেন্দ্র ও সৈয়দপুরস্থ স্বাদুপানি উপকেন্দ্রে মাছের লাইভ জীন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত এ লাইভ জীন ব্যাংকে দেশের বিলুপ্তপ্রায় মোট ১২০ প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে এ লাইভ জীন ব্যাংক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে কেননা প্রাকৃতিক জলাশয়ে কোন মাছ হারিয়ে গেলে জীন ব্যাংকে সংরক্ষিত মাছ থেকে তা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া যাবে।
দেশীয় মৎস্যসম্পদের প্রাকৃতিক ভাণ্ডার হিসেবে হাওর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়। হাওরাঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ১.২৮ লাখ টন মাছ আহরণ করা হয় যা অভ্যন্তরীণ জলাশয় হতে আহরিত মাছের ৯.১%। হাওর এলাকার জন্য লাগসই মাছ চাষ প্রযুক্তি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা উন্নয়নে ইন্সটিটিউট গবেষণা পরিচালনা করে জলাশয়সমূহের বাস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন, নিয়মিত হাওরাঞ্চলের পানি ও মাটির গুণাগুণ পরীক্ষণ, জীববৈচিত্র্য বা প্রজাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং হাওরাঞ্চলের জন্য লাগসই ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। ইন্সটিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় ও তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক ৫৩ প্রজাতির মাছের সর্বোচ্চ প্রজননকাল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রতি বছর ১৫ মে হতে ১৪ জুন পর্যন্ত দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। যা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় মাছ অবাধ ও নির্বিঘ্নে প্রজননের সুযোগ পাবে।
দেশের প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ, মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং স্থানীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ। অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একধাপ অগ্রসর হয়েছি। এতে একদিকে যেমন জলজ জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত হবে, তেমনি দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ইন্সটিটিউটের গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে অভয়াশ্রম ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় ইলিশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। নদীভিত্তিক অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় মাছের বিচরণ ও প্রজননে অর্থবহ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বিশেষ করে নিম্ন মেঘনা নদীতে পাঙ্গাস মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে পাঙ্গাসের আহরণ ছিল মাত্র ৩৭২ মেট্রিক টন, বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৬০০ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও, বোয়াল, আইড়, রিটা প্রভৃতি বড় আকৃতির দেশীয় মাছের বিচরণ ও প্রজননেও অভয়াশ্রমের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনার কারণে নদীনির্ভর দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়ছে, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে একদিকে যেমন জলজ জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত হবে, তেমনি দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।
অভয়াশ্রম শুধু মাছের জন্য নয় একটি জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ। এতে শুধু মাছ নয়, বরং জলজ উদ্ভিদ, কাঁকড়া, শামুক ও অন্যান্য প্রজাতিও সুরক্ষিত থাকে, যা পুরো ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। এই অভয়াশ্রমকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার, আপনার এবং সকলের। আমরা অভয়াশ্রম হতে মাছ ধরা বিরত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশীয় মাছ হতে পুষ্টি গ্রহণের সুযোগ পাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের প্রতিটি জলাশয় দেশীয় মাছে ভরে উঠবে।
লেখক: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের গবেষক
