বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও দেশে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও দুর্নীতির মতো অপকর্মসমূহ বন্ধ হয় নাই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় বাড়িয়াছে বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে? বিষয়টি গভীর উদ্বেগের কারণ। কেননা দলীয় সরকারের আমলে এই সকল অভিযোগ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হইলেও, একটি নিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতি দেশবাসীকে কি হতাশ করিতেছে না? স্বভাবতই এই প্রশ্নও উঠিতেছে, এই অপকর্মের হোতারা কাহারা এবং তাহাদের প্রকৃত পরিচয় কী? যদিও এই বিষয়ে দেশবাসীর সম্যক ধারণা রহিয়াছে, এবং অনেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করিতেছেন, তথাপি পরিস্থিতি কেন বদলাইতেছে না, তাহা লইয়া আলোচনার অবকাশ রহিয়াছে বইকি।
ইতিমধ্যে সেই দলটির পক্ষ হইতে এই সকল অপকর্ম রোধে যেই সকল ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে, তাহা প্রশংসার যোগ্য বটে। উদাহরণস্বরূপ, ছয় মাসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রায় ৩৫০ জনকে দলীয় পদ হইতে অপসারণ করা হইয়াছে এবং আরো ১০০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। ইহা নিঃসন্দেহে দলীয় সদিচ্ছারই প্রতিফলন; কিন্তু এতৎসত্ত্বেও পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হইতেছে না। তবে আশার বিষয় হইল, দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব এই সংকট মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতেছেন। তাহারা নিরন্তর চেষ্টা করিতেছেন এই সকল বেপরোয়া নেতাকর্মীদের লাগাম টানিয়া ধরিতে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই দেখা যায়, দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে এই সকল অপকর্মের নিন্দা করিতেছেন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি প্রদান করিতেছেন। দলীয় ফোরামেও এই বিষয়ে একাধিক বার আলোচনা হইয়াছে এবং একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টা চলিতেছে কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, অনেক ক্ষেত্রে এই সকল দুর্বৃত্ত শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্দেশও অমান্য করিতেছে।
এই পরিস্থিতির পিছনের রহস্য গভীর এবং বহুস্তরীয়। প্রথমত, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ হিসাবে কতিপয় ব্যক্তি অনৈতিক উপায়ে ক্ষমতা ও অর্থ উপার্জনে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। দলের মধ্যে তাহাদের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি হইয়াছে, যাহা ভাঙিয়া দেওয়া সহজ নহে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির লোভে কিছু ব্যক্তি দলের আদর্শ হইতে বিচ্যুত হইয়া নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করিতেছে। তাহারা জানে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরও শিথিল থাকে। এই সুযোগে তাহারা নিজেদের অপকর্ম চালাইয়া যাইতেছে। তৃতীয়ত, অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এই সকল অপকর্মকে আরো উসকাইয়া দিতেছে। কতিপয় অসাধু ব্যক্তি, যাহারা পূর্বেও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ছিল, তাহারা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখিয়া বা দলীয় প্রভাব খাটাইয়া এই সকল কার্যকলাপ চালাইয়া যাইতেছে।
এখন প্রশ্ন হইল-এই সংকট হইতে পরিত্রাণের উপায় কী? প্রথমত, দলীয় শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে আরো কঠোর হইতে হইবে। কেবল বহিষ্কার নহে, এই সকল অপকর্মের সহিত জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে দলকে আরো সক্রিয় হইতে হইবে। দ্বিতীয়ত, দলের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী জবাবদিহিতা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। নিয়মিতভাবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করিতে হইবে এবং অনিয়মের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। দলীয় পদ-পদবিতে সৎ ও নীতিমান ব্যক্তিদের বসানোর ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি রাখিতে হইবে। তৃতীয়ত, জনসাধারণকে সচেতন করিতে হইবে। জনগণই পারে এই সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে। দলীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এই বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে হইবে এবং জনগণকে চাঁদাবাজি, অন্যায়-অপকর্ম ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হইবার আহ্বান জানাইতে হইবে। চতুর্থত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত এই সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর হাতে দমননীতি গ্রহণ করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়-সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ, সুশীল সমাজ এবং সর্বোপরি জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দ্বারাই এই সমস্ত অপকর্মের নাগপাশ হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নতুবা, এই সকল বেপরোয়া কার্যকলাপ দেশের ভবিষ্যৎকে যে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলিয়া দিবে না তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই।
