বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠের স্থান নহে, ইহা একটি জীবন্ত সমাজ, একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। ইহার শিক্ষার্থীগণ যেমন পাঠ গ্রহণ করেন, তেমনই মানবিকতা, ন্যায্যতা ও সেবাবোধেরও চর্চা করেন। আধুনিক যুগে বিশ্বের যে কোনো আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। কারণ, স্বাস্থ্যহীন জীবন যেমন দুর্বিষহ হইয়া উঠে, তেমনই স্বাস্থ্যসেবাহীন বিশ্ববিদ্যালয়ও রুগ্ন হইয়া উঠে। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অথবা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র দেখিতে পাওয়া যায়। অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় জাবি ও ঢাবির কথাই ধরা যাউক। এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়েরই স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা মেডিক্যাল সেন্টার লইয়া দীর্ঘদিনের অভিযোগ রহিয়াছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার ১১ বৎসর পরেও মেডিক্যাল সেন্টারটিতে শুধু ৯ জন চিকিৎসক ও মাত্র তিনটি সচল অ্যাম্বুলেন্স রহিয়াছে প্রায় বিশ সহস্রাধিক স্টেকহোল্ডারের স্বাস্থ্যসেবার ভার বহনের জন্য। শয্যাবিশিষ্ট কোনো হাসপাতাল না থাকায় গুরুতর রোগীদের যথাযথ সেবা প্রদান তো দূরের কথা, স্বাভাবিক চিকিৎসাও অনেক সময়ে অসম্ভব হইয়া পড়ে। শুক্র ও শনিবার প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সুযোগ নাই; চুক্তিভিত্তিক ডাক্তারের উপর নির্ভরতা; ভুল রিপোর্ট ও ভুল চিকিৎসার প্রমাণিত অভিযোগের ফলে মেডিক্যাল সেন্টার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেই আস্থা গড়িতে পারিত-তাহাই ভাঙিয়া পড়িয়াছে। ফলে ব্যঙ্গ করিয়া শিক্ষার্থীরা সেই প্রতিষ্ঠানটিকে 'নাপা সেন্টার' নামে অভিহিত করে। অবস্থা এতই সংকটাপন্ন যে, চিকিৎসা বিলম্বের জন্য প্রাণ হারাইয়াছেন জাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দেড় লক্ষ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীর চিকিৎসার ভার বহন করিতে হইতেছে মাত্র ২৮ জন অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন চিকিৎসকের দ্বারা। হাসপাতালের ২০টি বেডের মধ্যে অনেকগুলি প্রায়শই অচল থাকে। রহিয়াছে ভাঙা কাঠামো, আবর্জনা ও নোংরা পরিবেশ। এত বড় একটি কেন্দ্রেও রাত ৮টার পর আর কোনো ঔষধ পাওয়া যায় না; প্যাথলজির স্যাম্পল নেওয়া হয় মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য এবং প্রকারান্তরে চিকিৎসাকেন্দ্রটি পরিণত হইয়াছে একটি ক্লান্ত ও অকার্যকর সরকারি দপ্তরে। কয়েক বৎসর পূর্বে ঢাবিতে এক শিক্ষার্থী এককভাবে অনশন করিয়া ছয় দফা দাবি জানাইয়াছিল। সেই দাবির মধ্যে ছিল প্রবেশপথে তথ্যকেন্দ্র, প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা, মেয়েদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা, আধুনিক সরঞ্জাম ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট-প্রত্যেকটি দাবিই মৌলিক নাগরিক অধিকার এবং মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ।
মেডিক্যাল অফিসার বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হয়তো সীমিত বাজেট, জনবলসংকট বা ইউজিসির গড়িমসি উল্লেখ করিয়া দায়সারা করিবার চেষ্টা করেন; কিন্তু প্রশ্ন হইল-প্রতি বৎসর কোটি কোটি টাকার বাজেট যেই বিশ্ববিদ্যালয় পায়, তাহার সদ্ব্যবহার ও অগ্রাধিকারে কেন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি থাকিবে না? চিকিৎসা যেমন বিলাসিতা নহে, তেমনি তাহা বিলম্বের বিষয়ও নহে। স্বাস্থ্য অবকাঠামো যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকারে না আসে, তাহা হইলে কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করিয়া জাতি গঠন যায় না। আরো গভীর সত্য এই-শুধু অর্থ বরাদ্দ করিলেই সেবার মান বাড়ে না, বরং কর্তব্যবোধ, স্বচ্ছতা ও মানবিক দায়বদ্ধতা ছাড়া যেই চিকিৎসা, তাহা রুগ্ন রাষ্ট্রব্যবস্থারই প্রতিফলন। চিকিৎসকদের দায়িত্বচ্যুতি, আগেভাগে চেম্বার ত্যাগ, দায়সারা কর্মী-ইহাও এক প্রকার শৈথিল্য ও নৈতিক অবক্ষয়, যাহা অর্থের দ্বারা পূরণ হইবার নহে।
সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার যেন হয় একটি কার্যকর, বিশ্বাসযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, পরীক্ষার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত ঔষধের সরবরাহ এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবার নিশ্চয়তা। কেবল প্যারাসিটামল আর ব্লাড টেস্ট দিয়াই চিকিৎসার দায় মেটানো যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় হইল সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক হৃৎপিণ্ড-সেই হৃৎপিণ্ডে যদি অসুখ বাসা বাঁধে, তাহা হইলে জাতির মস্তিষ্ক আর সুস্থ থাকিবে কী করিয়া? তাই যেইখানে অসুখ, সেইখানেই চাই উপশম।
