চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার পূর্বেই প্রার্থী চূড়ান্ত ও দলীয় প্রভাবের গুঞ্জন

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫, ২৩:২৩

২৯ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের তালিকা পরীক্ষার পূর্বেই চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। একই সাথে উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিভাগটির শিক্ষক নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ডের তিন সদস্য নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিবর্গের প্রশ্ন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ৬টি স্থায়ী/অস্থায়ী প্রভাষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৯২ জন পরীক্ষার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেওয়া, তা মূল্যায়ন পরবর্তী প্রেজেন্টেশন গ্রহণ এবং চূড়ান্ত ভাইভা পরীক্ষা গ্রহণ কেবলমাত্র নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ডের তিন জন শিক্ষক দ্বারা সম্পন্ন করা যেমন দুরূহ কাজ তেমনি সন্দেহপ্রবণ।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক/প্রভাষক পদে শিক্ষক নিয়োগের নির্বাচনী বোর্ডের সদস্যরা একটি রাজনৈতিক দলপন্থী, একই সাথে নানান অপরাধ ও দুর্নীতির দায়েও বিতর্কিত। 

বিভাগটির এই শিক্ষক নিয়োগে নির্বাচনী বোর্ডের সদস্যরা হলেন- ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী (প্রাক্তন অধ্যাপক) প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চবি। বর্তমান, উপাচার্য, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক ড. মোসাম্মৎ রাশেদা চৌধুরী, সভাপতি, প্রাণিবিদ্যা, চবি এবং ড. শাহ হোসাইন আহমেদ মেহদী (অধ্যাপক) প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে এবং অধ্যাপক ড. শাহ হোসাইন আহমেদ মেহদীর বিরুদ্ধে ছাত্রাবস্থায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে কারাবাসসহ পরবর্তীতে শিক্ষক অবস্থায়ও কারাবরণের দায় রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. জাহেদুর রহমান চৌধুরীর বলেন, ‘প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে একটি বিশেষ মতাদর্শের ব্যক্তিবর্গের সন্নিবেশ ঘটানো হয়। আমাদের প্রাক্তন সহকর্মী ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী স্যারের বিরুদ্ধে আইআইইউসিতে দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হওয়ার কথা বারবার পত্রিকায় এসেছে। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়ার আগে উনার উচিত হয়নি আরও সমালোচনার জন্ম দেয়া। অপর সদস্য অধ্যাপক ড. শাহ হোসাইন আহমেদ মেহদী সম্পর্কে কথা বলার অভিরুচি আমার নাই। তার কারাবরণের কথা অনেকেরই জানা আছে।’

এছাড়াও, ২০২২ সালের যুগান্তর ও ডেইলি ক্যাম্পাসসহ একাধিক পত্র-পত্রিকায় অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদীর বিরুদ্ধে আইআইইউসির টাকা আত্মসাতের ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে এবং অধ্যাপক ড. শাহ হোসাইন আহমেদ মেহদীর কারাবাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে একটি আলোচিত ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯ জুলাই সকাল ১০টায় চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ৬টি স্থায়ী/অস্থায়ী প্রভাষক পদের নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই জামাত-শিবিরের দলপন্থী ৬ জন প্রার্থীকে অর্থের বিনিময়ে দলীয় প্রভাবে নিয়োগের জন্য গোপনে চূড়ান্ত করা হয়েছে, ইতোমধ্যে উক্ত ৬ জনের মধ্যে ৪ জনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তারা হচ্ছেন- মুমিন ( পিতা: আব্দুল আজিজ), মো. সাইফুল ইসলাম (পিতা: মো. লিয়াকত হোসেন), মিজানুর রহমান খান পাঠান (পিতা: আব্দুল আলী খান পাঠান), মাহবুবা বিনতে ফাতেমা (পিতা: মোঃ মশিউর রহমান)। এরমধ্যে মুমিন প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে এম এস করেনি, তিনি একুয়াকালচার বিভাগ থেকে এম এস করা। যা নিয়োগ প্রক্রিয়ার শর্তের সাথে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন বিভাগটির সাথে সম্পৃক্ত একাধিক শিক্ষক। 

সমালোচিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার আরেক বিতর্কিত দিক হলো- বিভাগটির পরিকল্পনা কমিটির ৯২৭তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক/ প্রভাষক পদে শিক্ষক নিয়োগের নির্বাচনী বোর্ডে বিভাগটির অধ্যাপক ড. মো মনজুরুল কিবরীয়া কে এক নম্বর সদস্য হিসেবে সুপারিশ করা হলেও ড. মো মনজুরুল কিবরীয়া সহ বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সুপারিশকৃত তালিকার কাউকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন উক্ত নিয়োগ বোর্ডের সদস্য পদে মনোনয়ন দেয়নি। 

এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে চবির উপাচার্য বরাবর প্রেরিত লিপিতে অধ্যাপক ড. মো মনজুরুল কিবরীয়ার বলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্ট, ১৯৭৩ এর প্রথম সংবিধির 5(2)(b) ধারা অনুসারে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রেরিত পত্রের প্রেক্ষিতে বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির ৯২৭ তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক/প্রভাষক পদে শিক্ষক নিয়োগের নির্বাচনী বোর্ডে আমাকে এক নম্বর সদস্য হিসেবে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করে তালিকার কাউকে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আমি মনে করি, বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির সুপারিশকৃত প্রতিনিধি ছাড়া নিয়োগ কমিটি গঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এক্ট, ১৯৭৩ এর সংবিধির পরিপন্থী, জুলাই বিপ্লবের চেতনা বিরোধী এবং বিভাগের স্বার্থ ও প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করার শামিল। এতে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের পরিকল্পনা কমিটিকে যেমন অবজ্ঞা করা হয়েছে তেমনি ব্যক্তিগতভাবে আমার শিক্ষকতা জীবনে সবচেয়ে অসম্মান এবং অপমানবোধ অনুভব করছি। আমি মনে করি এতে বৈষম্য বিরোধী প্রশাসনের কাছে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি এবং বিভাগটির শিক্ষক নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. মোসাম্মৎ রাশেদা চৌধুরী বলেন, আমার ২৪ বছরের ইতিহাসে আমি কোনদিন দেখিনি প্ল্যানিং কমিটিতে আমরা যাকে বলি তাকে রাখছে প্রশাসন।” পরীক্ষার পূর্বেই বিশেষ কিছু প্রার্থীদের গোপনে নিয়োগ চূড়ান্ত করার বিষয়টা জানতে চাওয়ার পরবর্তীতে এ বিষয়ে আলোচিত প্রার্থীদের কথা উল্লেখ করলে এর মধ্যকার অধ্যাপক ড. মোসাম্মৎ রাশেদা চৌধুরীর প্রাক্তন শিক্ষার্থী সম্পর্কে তিনি বলেন, মুমিন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট একটা ছেলে এবং সে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির পিএইচডি করা এমফিল করা। সে ওখানের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, সেরকম একটি ক্যান্ডিডেট যদি আমাদের এখানে আসে লেকচারার হয়ে, সে তিন লাখের বেতন ছেড়ে যদি এখানে ৩০ হাজার টাকার বেতনে আসে সেটা তো অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার।

তিনি আরও বলেন, এখানে মাহবুবা বিনতে ফাতেমার হিস্ট্রি দেখেন, সেও তো ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ছিল। তাহলে গত বছর তার চাকরি হলো না কেন, তার কোন লবিং ছিলো না বলে। তার সেম ব্যাচেই তো দুজনের চাকরি হয়েছে। একজন হচ্ছে পঞ্চমতম, একজন হচ্ছে সেকেন্ড। সেও তো ফার্স্ট ছিল, সে অনার্সে ফার্স্ট ছিল মাস্টার্সেও ফার্স্ট ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়গুলো আমার কাছে একটার চেয়ে একটা বেশি উদ্ভট এবং কাল্পনিক মনে হয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে জানানো হয়, আইআইইউসি'র ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদীর নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম-এ নিয়োগ বাণিজ্য” নামে মুদ্রিত আরোপিত কথাটি একেবারেই অবান্তর, বিভ্রান্তিমূলক, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আইআইইউসি'র স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে ছয় মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হলো। কিন্তু 'নিয়োগ বাণিজ্য' হয়েছে এমন অভিযোগ কখনও উঠেনি।

এ বিষয়ে প্রতিবেদক জানান, চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে পরীক্ষার পূর্বেই প্রার্থী চূড়ান্তকরণের গুঞ্জন বিভাগটির শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল। আমি আলোচিত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ পূর্বক তথ্য নির্ভর প্রতিবেদন তৈরি করেছি। এছাড়াও উক্ত নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের দলীয় মতাদর্শ এবং বিতর্কিত দিকগুলো আমি বিভিন্ন সংবাদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের বক্তব্যের সূত্রেই পেয়েছি।

ইত্তেফাক/এএইচপি