প্রকৃতির প্রতিশোধ: এক বৈশ্বিক বিপর্যয়

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৫, ০৪:০০

পৃথিবী আজ বড়ই অস্থির। ইহার বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধবিগ্রহ, উদ্বেগ-উত্তেজনার অন্ত নাই। কয়েক দিন ধরিয়া কয়েকটি দেশে বিমান দুর্ঘটনার খবর পাইয়া আমরা অশান্ত ও উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়িলাম। আমরা গাজায় যেমন ত্রাণের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের উপর নৃশংস ও অমানবিক হামলা দেখিলাম, তেমনি থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়ার সীমান্তে উত্তেজনাও লক্ষ করিলাম; কিন্তু প্রকৃতিও কি উত্তপ্ত ও অস্থির নহে?

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটি এবং আশপাশের এলাকায়ও ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ফলে বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করিয়াছে নিউ ইয়র্ক রাজ্যের পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য বিভাগ। লং আইল্যান্ড, নিউ ইয়র্ক সিটি মেট্রো, লোয়ার হাডসন ভ্যালি, আপার হাডসন ভ্যালি ও অ্যাডিররন্ড্যাকস এলাকায় জারি করা হইয়াছে এই সতর্কতা। দাবানলের কারণে কানাডার হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। শুধু কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র নহে, দাবানলে বিপর্যস্ত ও তটস্থ গ্রিসও। রাজধানী অ্যাথেন্সসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়িয়াছে দাবানল। গ্রিস জুড়িয়া অন্তত পাঁচটি বড় দাবানলের খবর পাওয়া গিয়াছে। সেইখানে স্থানীয় নাগরিকদের সরাইয়া নেওয়া হইতেছে। চলমান দাবানলে বনাঞ্চল পুড়িয়া ছারখার হইয়া গিয়াছে। বহু সম্পত্তি ধ্বংস হইয়াছে। আহতও হইয়াছেন অনেকে। তীব্র দাবদাহ ও দমকা হাওয়ার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ লাভ করিয়াছে। ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলিতে আজকাল নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছড়াইয়া পড়িতেছে। অথচ কয়েক দশক পূর্বেও পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ ছিল না। ইদানীং বন্যা, খরা ও দাবানলের মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনাম হইতেছে এই সকল দেশ। বাংলাদেশে বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি দুর্যোগ নূতন কোনো বিষয় নহে। আমরা অনেকটা ইহাতে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এই জন্য দেখা যায়, এই সকল দুর্যোগে আমাদের হতাহতের সংখ্যা এখন তুলনামূলক কম; কিন্তু উন্নত দেশগুলি পড়িয়াছে বিপাকে। তাহাদের এখন আমাদের মতো দেশগুলি হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে।

প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ প্রকৃতির এক নীরব প্রতিশোধও বটে। যেই সকল দেশ শিল্পোন্নতির শীর্ষে আরোহণ করিয়াছে, তাহারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করিলেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হইয়াছে। এই ব্যর্থতা আজ তাহাদের দোরগোড়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আকারে ফিরিয়া আসিতেছে বলিলে কি ভুল হইবে? প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি মানবজাতিকে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়াছে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাণ্ডব একই সূত্রে গাঁথা। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত লোভ এবং ক্ষমতার লিপ্সা প্রকৃতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলিতেছে। আল-কুরআনও এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করিয়াছে। সূরা আর-রুম-এর ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে: 'স্থলে ও জলে ফ্যাসাদ প্রকাশ পাইয়াছে মানুষের কৃতকর্মের দরুন, যেন তাহাদের কোনো কোনো কর্মের ফল তাহাদেরকে আস্বাদন করানো হয়, হয়তো তাহারা ফিরিয়া আসিবে।' এই আয়াত স্পষ্টতই নির্দেশ করিতেছে যে, যখন মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তখন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং তাহার পরিণতিতে বন্যা, খরা, দাবানল এবং অন্যান্য দুর্যোগ দেখা দেয়। আমরা যদি এই পরিস্থিতি হইতে শিক্ষা গ্রহণ না করি, যদি আমাদের জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন না করি, এবং পরিবেশের প্রতি সহানুভূতিশীল না হই, তাহা হইলে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে।

উন্নত দেশগুলি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক হইতে সমৃদ্ধ হইলেও দ্রুত পরিবর্তনশীল চরম আবহাওয়ার জন্য তাহাদের প্রয়োজনীয় অভিযোজন ব্যবস্থা (যেমন ড্রেনেজ সিস্টেম বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা) অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল। এমনকি উন্নত প্রযুক্তি থাকার পরেও অনেক সময় দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মানুষকে দুর্যোগের বিষয়ে সতর্ক করিতে এবং সরাইয়া নিতে ব্যর্থ হয়। এই জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাহাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার যে অভাব রহিয়াছে তাহা দূর করিতে হইবে। আমাদের সকলের জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করিতে হইবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাইয়া সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করিতে হইবে। মানুষ হিসাবে আমাদের দায়িত্ব শুধু নিজেদের বাঁচানো নহে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও রক্ষা করা এবং একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়িয়া তোলা।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন