বক্সিং কাঁপালেন জিনাত

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৫, ১২:১৯

জাতীয় নারী বক্সিংয়ে সপ্তম আসর। শেষ দিন। মোহাম্মদ আলী বক্সিং রিংয়ে লড়াই করবেন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জিনাত ফেরদৌস। ৫২ কেজি ওজন শ্রেণির ফাইনালে জিনাতের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের সাতক্ষীরার মেয়ে আফরা খন্দকার। লড়াই দেখার জন্য সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল সাংবাদিকদের। বক্সিংয়ে এত সাংবাদিকের উপস্থিতি গত দুই দশকেও দেখা যায়নি। সবাই জানতেন জিনাত লড়াইয়ে জিতবেন। কারণ জিনাতের জন্ম, বেড়ে ওঠা, আধুনিক সুবিধায় প্রস্তুতি নেওয়াসহ সবদিক থেকে জিনাত এগিয়ে। 

জিনাতের চেয়ে বয়সে ছোট আফরা। বক্সিং রিংয়ে প্রত্যাশানুযায়ী ফল পেয়েছেন জিনাত। তিন রাউন্ডে হারিয়ে দিয়েছেন আফরাকে। আফরাও জানতেন তিনি পারবেন না। কৌশল নিয়েছিলেন আনসারের পতাকাতলে লড়াই করা আফরা। বক্সিং রিং থেকে নেমে ড্রেসিং রুমে গিয়ে প্রথমেই কেঁদে ফেললেন। ছোট মানুষ, সইতে পারেননি। রিং থেকে নামার সময় জিনাত একটা টি-শাট দিয়েছেন আফরাকে। সেটা হাতে নিয়ে কথা বললেন আফরা। 'আসলে আমার প্রস্তুতি আর জিনাত আপুর প্রস্তুতি এক নয়। উনি উন্নত দেশে খেলে বড় হয়েছেন। আর আমরা যদি সেরকম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাই তাহলে ভবিষ্যতে
জিনাত আপুও আমাদের কাছে হেরে যাবে।'

আফরা যখন ওয়ার্মআপ জোনে কথা বলছেন, মাত্র লড়াই করে ফেরা জিনাত তখন বক্সিং ফেডারেশনের সভাপতির এসি রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সাংবাদিকরা তার অপেক্ষায়। সব আকর্ষণ জিনাতকে নিয়ে হলেও প্রতিপক্ষ আফরা খন্দকারের বাড়তি আকর্ষণ ছিল, তিনি জাতীয় নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারের বোন। তিন বছরের ছোট আফরা। আফঈদা এবং তাদের বাবা খন্দকার আরিফ হাসান প্রিন্স এবং মা মমতাজ খাতুন মীরা গ্যালারিতে বসে আফরার খেলা দেখেছেন। মায়ের হাতে টিস্যু। চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ মুছলেন। 

মেয়ের খেলা কেমন লাগল?  জানতে চাইলে আফরার মা বললেন, 'আমি সব সময় খেলা দেখি। হার-জিত আছে। এটাই তো খেলা।' খেলা হলেও তো চোখের সামনে মেয়ে মার খাচ্ছে এটা দেখে মা হিসেবে খারাপ লাগারই কথা। আফরার মা বললেন, 'দেখেন না চোখ মুছতে হচ্ছে।' পুরো গ্যালারির একদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা, অন্যদিকে জিনাতের দল গুডউইল বক্সিং ক্লাবের সমর্থকরা ব্যানার নিয়ে চিৎকার করছেন। 

আর আফরার বাবা একাই গ্যালারি থেকে চিৎকার করে মেয়েকে লড়াই করার সাহস দিচ্ছিলেন। পাশেই বসা ছিলেন নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার। সঙ্গে এনেছিলেন রিফাসহ তিন ফুটবলারকে। বোনের খেলা দেখে কেমন মনে হলো? বোনের মুখের ওপর জিনাতের পাঞ্চগুলো দেখে কষ্ট পাচ্ছিলেন বড় বোন আফঈদা খন্দকার। ইত্তেফাককে আফঈদা বললেন, 'আমার খুব ভয় লেগেছে। আফরা মার খাচ্ছে তাই ভয় লেগেছে। আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি গিয়ে ওরে (জিনাত) মেরে আসি।' আফরা বললেন, 'আমার টার্গেট ছিল আমি তিন রাউন্ড পর্যন্ত যেন খেলতে পারি। সেটা করতে পেরেছি। উনি (জিনাত) অনেক উন্নত খেলোয়াড়। আমি চিন্তা করেছি ডিফেন্স করবো। সেটাই করার চেষ্টা করেছি।' 

তিন রাউন্ডে হেসেখেলেই জিতেছেন জিনাত। সংবাদমাধ্যমের কাছে তার প্রতিক্রিয়া জানালেন, 'বাংলাদেশের ছেলে এবং মেয়েরা খেলতে চায়। আফরার বিষয়ে যদি বলি অনেকে আছে হাল ছেড়ে দেয়। আফরা সেটা না। আফরা মনে কষ্ট পেয়েছে, তবে টেকনিকটা যদি আরও উন্নতি করে তাহলে আরও ভালো করবে।' 

আফরার বিপক্ষে নামার আগেই জয় নিশ্চিত মনে করেন কিনা? জিনাত বলেন, 'যখন খেলতে নামি তখন মাথায় থাকে আমি হারবো না।' মুখে না বললেও বুঝা যায় নারী বক্সিংয়ের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের জিনাতের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। জিনাত সেরা হবেন সেটা সবারই ধারণা ছিল।

জিনাত গত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছিলেন। তাকে নিয়ে সংগঠকরা অনেক বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন পদক এনে দিতে পারেন কিনা। কিন্তু এশিয়ান গেমসে হতাশা ছাড়া কিছু দিতে পারেননি। এবার জাতীয় বক্সিংয়ে প্রথম খেলতে এসেছিলেন। জিনাত বলেন, 'ভাই আমি যখন এশিয়ান গেমসে খেলেছি, তখন দুই বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে খেলেছি। এখন আমার চার বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে খেলেছি। এখন আমি ফাইটার হিসেবে উন্নতি করেছি। আত্মবিশ্বাস হয়েছে আরও বেশি।' আগামী এশিয়ান গেমসে পদক এনে দেওয়ার প্রশ্নে জিনাত ফেরদৌস বলেন, 'ইনশা আল্লাহ।'

ইত্তেফাক/জেডএইচ