গভীর রাতে, নগরের এক জনশূন্য অলিতে-গলিতে ছায়ার মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে একদল কিশোর। তাহাদের হাতে রেঞ্চ, প্লাস, স্ক্রু-ড্রাইভার। কাহারো কোমরে রশি বাঁধা, কেউ-বা সিগারেট টানিতে টানিতে হাঁটিতেছে। হঠাৎ থামিয়া গেল তাহারা-নির্জন ফ্লাইওভারের পিলারের গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া, তাহারা ঝুঁকিয়া পড়িল একখানি স্টিল গার্ডারের দিকে। ক্লিক... ক্লিক... এক এক করিয়া খুলিতে লাগিল নাট-বল্টু। কেহ বাধা দিল না। আসলে বাধা দেওয়ার কেহ নাইও। বাধা দিতে পারিত ঐ কিশোরদের বিবেক; কিন্তু তাহাদের বিবেকের কর্ণ যেন সিসা দিয়া বন্ধ করা। সুতরাং তাহাদের দুষ্কর্ম কেহ জানিল না। অবশ্য জানিলেও কী লাভ হইত? ঐ দুর্বৃত্তদের দিকে তাড়িয়া যাইবার সাহস সাধারণ মানুষের নাই। কাহারো এই প্রশ্ন করিবার সাহসও যেন নাই-এইভাবে একটি অবকাঠামোর নাট-বল্টু যদি খুলিয়া ফেলা হয়, তাহা হইলে পুরা অবকাঠামোই প্রবল ঝুঁকির মধ্যে পড়িবে। ইহা যেন বিলিয়ন টাকার বান্ডিল সামান্য ছাগলে খাইয়া ফেলিবার মতো। ঘটনাস্থল চট্টগ্রাম নগরের আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার। ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত, প্রতিদিন যাহার উপর ৮০ হাজার গাড়ি চলাচল করে-সেই স্থাপনা হইতে নাট-বল্টু সরাইয়া লওয়া হইতেছে! এমনকি নিরাপত্তাবেষ্টনীও খুলিয়া লওয়া হইতেছে। গাছ মরিয়া যাইতেছে, আলো নিভিয়া গিয়াছে।
আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারটির নাট-বল্টু যথেচ্ছভাবে খুলিয়া লইবার ঘটনাটি যেন তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশের প্রতীকী চিত্র। শুধু ফ্লাইওভার নহে, যেন দেশটির ভিত্তিমূলক অবকাঠামোগুলির নাট-বল্টু আলগা করিয়া দেওয়া হইতেছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তম্ভ তো অনেকটা এক-একখানি গার্ডার-তুল্য। গণমাধ্যম, আইন-বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, এমনকি নাগরিক সমাজ-সকলেই এক একটি বোল্ট-জোড়া স্টিলের বিম। তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, জবাবদিহিতা এবং তদারকির পরিবর্তে যদি এই সকল প্রতিষ্ঠানের নাট-বল্টু খুলিয়া লওয়া হয়, তাহা হইলে সেই দেশটির কী দশা হইতে পারে? তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশই যেন সেই বিপজ্জনক আগলা দশার মধ্যে রহিয়াছে। সুশাসনের বল্টু ঢিলা, গণমাধ্যমের পিলার বাঁকিয়া যাওয়া হইতে শুরু করিয়া না-বলা আরো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পিলারের ছত্রে ছত্রে নাট-বল্টু ঢিলা কিংবা চুরি হইয়া গিয়াছে।
এই আলগা নাট-বল্টুগুলিকে কঠোর হস্তে টাইট করিবার দায়িত্ব যাহাদের হাতে, তাহারাও যেন তোতাপাখির বুলির মতো বলিতেছেন- 'আমার জানা নাই', 'ইহা আমার দায়িত্ব নহে', 'পূর্বে কেহ দেখিয়াছে কি না, জানি না'-ইত্যাদি; কিন্তু রাষ্ট্র তো কেবল নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক কাঠামো দিয়া তৈরি নহে, ইহার একটি নৈতিক কাঠামো রহিয়াছে, একটি সামাজিক মীমাংসা রহিয়াছে। যদি তাহার সংযোগস্থলের নাট-বল্টু দিনদিন চুরি হইতেই থাকে, তাহা হইলে সেই রাষ্ট্র টালমাটাল থাকিবে, সামান্য কম্পনেই ধসিয়া পড়িতে পারে।
কিন্তু এইভাবে তো চলিতে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের সচেতন নাগরিকরা অন্তত এইটুকু অনুধাবন করিতে পারেন, তাহাদের দেশকে রক্ষা করিতেই হইবে, তাহা না হইলে দেশের মানুষের রক্ষা হইবে কী করিয়া? সুতরাং সময় থাকিতে সতর্ক হইবার বিকল্প নাই। সময় গেলে সাধন হইবে না। মেরামত করিতে হইবে, শক্ত করিয়া বাঁধিতে হইবে সকল সংযোগ। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের ভিতর মরিচা পড়া অবস্থার উত্তরণ ঘটাইতেই হইবে। প্রতিহত করিতে হইবে তাহাদের, যাহারা নাট-বল্টু খুলিয়া লইতেছে সামান্য আর্থিক লাভের জন্য। ইহাদের প্রতিহত করিতে না পারিলে নাট-বল্টু খুলিয়া যাওয়া তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশে একটির পর একটি স্থাপনা ধসিয়া পড়িবে-আর সেই ধসের নিচেই চাপা পড়িবে সাধারণ জনগণ।
