বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের ভিত্তি

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ১৭:৫০

২০০৮ সাল থেকে গড়ে ওঠা কায়েমি রাজনৈতিক গোষ্ঠীতন্ত্রভিত্তিক অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সর্বজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দিনের পর দিন প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গণতান্ত্রিক অধিকারহীনতা জারি রেখে, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে গণমানুষের উপর জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক নিপীড়ন চালিয়েছে। এই নিষ্পেষিত জীবন থেকে মুক্তির আশায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনতা দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েছেন। গুম-খুনসহ লাখ-লাখ মানুষ পৈশাচিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। পুঞ্জিভূত আক্রোশ-আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল-২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান। মূলত অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ফেলে জনতার জনরোষে জন আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে বিযুক্ত পূর্ববর্তী সরকার অপসারিত হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তত ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। অনিশ্চয়তার কুয়াশা ঘন হয়। প্রচেষ্টার অভাবে নয়, বরং দিকনির্দেশের অভাবে অর্থনীতি স্থবির হতে শুরু করে। বাংলাদেশ আবারও এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে গণতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের সাথে মিলিত হতে হবে। কিন্তু, বৈধ নির্বাচন ছাড়া সেই নির্মাণ সম্ভব নয়। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি।

এবার আসা যাক বিভিন্ন খাতে সংস্কার প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন আইন, আদালত, প্রশাসন ইত্যাদি) অনেক সময়ই অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা কাঠামোর প্রভাববলয়ে থেকে ক্ষমতাধর পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক দ্বারা পরিচালিত হয়। এ অনানুষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর শিকড় অতি গভীরে প্রোথিত এবং সেখানে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলে সেগুলো স্থিতি জড়তায় আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। সুতরাং হঠাৎ বড় সংস্কার আনার চেষ্টা করলে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এবং গোটা সংস্কার কার্যক্রমই ব্যর্থ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বলা যেতে পারে। দেশটি ১৯৬০-৮০ সালের মধ্যে প্রথমে রপ্তানিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলে। তারপর তারা ধীরে ধীরে আর্থিক খাত উন্মুক্ত করে; কিন্তু তারা সব সময় রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান ও নজরদারি বজায় রেখেছে। হীরাসমৃদ্ধ বতসোয়ানা ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করেছে, পাশাপাশি তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীও করেছে। ফলে তারা নাইজেরিয়ার মতো তেলনির্ভর দেশগুলোর 'রিসোর্স কার্স' বা 'সম্পদের অভিশাপ' এড়িয়ে যেতে পেরেছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ১৯৯০ দশকে দ্রুত বেসরকারিকরণ ও বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ার 'শক থেরাপি' জাতীয় সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়। যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও যোগ্য নেতৃত্ব না থাকায় বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। নব্য ধনীরা সবকিছু দখল করে নেন আর সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে এলোমেলো টুকরা টুকরা সংস্কার (অ্যাডহক ইনক্রিমেন্টালিজম) দেখা গেছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, কৌশল ও পরিকল্পনার অনুপস্থিতিতে সংস্কার অগ্রযাত্রাকে স্থবির বা পিছিয়ে দিয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা একটি অপরটির সঙ্গে জড়িত। যেমন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সফল হচ্ছে না। একটি মতবাদ অনুযায়ী, সব সমস্যা একসঙ্গে সামাল দিতে হলে 'বিগ পুশ' বা 'বড় ধাক্কা'র মতো সমন্বিত সংস্কার দরকার। কিন্তু এই 'বিগ পুশ' তত্ত্ব নিয়ে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ হার্শম্যান বলেছিলেন, যদি উন্নয়নশীল দেশগুলোর এমন সমন্বিত সংস্কার চালানোর সামর্থা থাকত, তবে তারা আদৌ অনুন্নত থাকত না।

বর্তমানে অর্থনীতি বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৩.৯৭ শতাংশ। কোভিডের সময় বাদ দিলে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। জিডিপির তুলনায় কর আহরণ মাত্র ৭.২ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায় আগের বছরের তুলনায় জিডিপির ০.৬৬ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে। ৪০৯ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার। এক বছরের ব্যবধানে সরকারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ২১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যাংক খাতে অনাদায়ি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। বৈদেশিক জ্বালানি নির্ভরতা ও টাকার মান কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎব্যয় বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানহীনতা, আয়-ব্যয় বৈষম্য এবং অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা আজও সংকটাপন্ন। বিশ্বব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি, চাকরি হারানো ও অর্থনীতিতে ধীরগতির কারণে দারিদ্র ও বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র হার ২২.৯ শতাংশ এবং অতি দরিদ্রের হার ৯.৩ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে অতি দরিদ্রের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও, মন্দাভাব, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও আয়বৈষম্য জনিত স্ট্যাগফ্রেশনের আশঙ্কা রয়ে যায়। এই ধরনের পরিস্থিতি অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।

অর্থনীতি কেবল সুদের হার বা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নয়। জন-মানুষ এবং তাদের ভবিষ্যৎ গঠনের অধিকারই অর্থনীতি। সেই অধিকারের পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও উদ্দীপনা। জনগণ কথা বলুক। গণতান্ত্রিক অনুশীলনে রূপান্তরের যাত্রা শুরু হোক।

তবে চলমান রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে উৎসারিত স্বজনতোষী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বজনের অংশগ্রহণের সুযোগ নাই। নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিনিয়োগ স্থবির। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে না। প্রকৃত মজুরি কমছে; অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে অধিকাংশ মানুষ বিপর্যন্ত। লাগামহীন বৈষম্য বেড়েই চলেছে। সম্ভাবনার বাংলাদেশ সর্বজনের সর্বজনীন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে বারবার হোঁচট খাওয়ায় জনগণ ন্যায্য অর্থনৈতিক ফলাফল থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়ে পুনরুদ্ধারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। বৈধ পথে প্রবাসী আয়, বিদেশি ঋণের প্রবাহ ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ কম হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থায় পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন, আইনি কাঠামোয় পরিবর্তনসহ সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে পতিত সরকারের বাজেট অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই পরিবর্তনের দরকার ছিল। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সংসদ না থাকায় সংবিধানের ৯৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাজেট প্রণয়ন ও অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। অন্যান্য বিষয়ে যেমন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করছে, সরকার জনগণের সঙ্গে অনুপস্থিত সপ্তযোগ পূরণে বাজেট বিষয়েও আলোচনা করতে পারত। বাজেট বিষয়ে বর্তমান সংবিধানে জনগণের সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব বিষয়ক ঘাটতি রয়েছে। উক্ত আলোচনা হলে ঘাটতি পূরণে সংস্কারের রূ পরেখাও অর্জিত হতো।

সামনের পথ জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা যাবে না। কাঠামোগত বৈষম্যগুলো দূর করতে হবে। প্রচুর কর্মসংস্থান দরকার। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং নয়া শিল্পনীতির ভিত্তিতে বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা তৈরি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে সস্তা শ্রমের পরিবর্তে মূল্য সংযোজনকে উৎসাহিত করলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কাঠামোগত সংস্কারের জন্য মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি সার্বিক কৌশল ও পরিকল্পনা জরুরি। রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ছাড়া মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

তবে স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীল রাজনীতি অপরিহার্য। বিনিয়োগকারীরা গোধূলিতে বাজি ধরে না, সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করে। এই কারণেই সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। শুধু বৈধ সরকারই প্রকৃত র পান্তরের জন্য আস্থা, পরিবেশ ও নীতি স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারে।

অর্থনীতির জরুরি মেরামতের চেয়ে বেশি প্রয়োজন অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন। জনগণই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতি গড়ে তোলার আসল কাজ শুরু করতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়কের অস্থায়ী প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং নাগরিক কর্তৃক নির্বাচিত এবং তাদের কাছে দায়বদ্ধতা থেকেই অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন সম্ভব।

লেখক: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এএম