খুদে মেসির জাদু দেখতে বাড়ির উঠানে ভিড়, দারিদ্র্যের কষাঘাতে হতাশ বাবা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ১২:৫৯

ছোট্ট দোচালা টিনের ঘর। একটু বৃষ্টি হলেই সেই ঘরে ঝরে পানি। জরাজীর্ণ এ ঘরেই পরিবার নিয়ে থাকেন সোহেল প্রধান। সোহেলের জরাজীর্ণ এ বাড়ির উঠানেই গত কয়েকদিন ধরে ভিড় করছেন আশপাশের গ্রামের মানুষ। মূলত তারা সোহেল প্রধানের ৫ বছরের ছেলে সোহানের পায়ের জাদু দেখতেই ভিড় করছেন। ফুটবল নিয়ে সেখানেই সকাল সকাল প্রাকটিসে নামে বাবা-ছেলে।

সম্প্রতি সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবল নিয়ে সোহানের প্রাকটিসের একটি ভিডিও। এরপর ‘চাঁদপুরের খুদে মেসি’ খ্যাতি জুটেছে তার। ফুটবল নিয়ে খুদে মেসি স্বপ্নে বিভোর থাকলেও দারিদ্র্যের কষাঘাতে হতাশ সোহেল প্রধান। 

একদিকে অর্থাভাব অন্যদিকে প্রতিভার এমন লড়াইয়ের গল্পটা চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সাড়ে পাঁচানী গ্রামের সোহেল প্রধানের ও তার ৫ বছরের ছোট্ট বালক মেসি খ্যাত সোহানের।

জানা গেছে, সবেমাত্র স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছেন সোহান। তবে এরই মধ্যে রপ্ত করেছে ফুটবলের নানা কৌশল। বাবার হাত ধরে প্রতিদিন সকালে বাড়ির উঠানে প্রাকটিস শুরু করে সোহান। সেখানে কখনও দুহাত পেছনে দিয়ে ডান পা, বাম পা, পিঠ, মাথায় বল নিয়ে রাখছেন কন্ট্রোলে (মাটিতে না ফেলে)। কখনও নিজের বয়সের কয়েকগুণ বড়রাও তার ড্রিবলিংয়ে পড়ছেন বেকায়দায়। বড়দের সঙ্গে প্র্যাকটিসেও দেখা গেল তার বল নিয়ন্ত্রণে রাখার নানা কৌশল। বল পায়ে ড্রিবলিং, রিসিভ, বলের উপর কন্ট্রোল, ক্ষিপ্ত গতি, এবং সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে পাঠানোর কৌশলসহ খেলার মাঠে শৈল্পিকতা সবার নজর কেড়েছে।  

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোহানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল করুণ চিত্র। এসময় ফুটবল নিয়ে সোহান ও পরিবারের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন সোহেল প্রধান। তবে সবকিছু ছাপিয়ে হতদরিদ্র এ বাবার কণ্ঠে উঠে এসেছে নানা হতাশার কথা।

ইত্তেফাককে সোহেল প্রধান বলেন, ‘বৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান এই পাঁচজন নিয়ে আমার পরিবার। স্থানীয় পাঁচানী বাজারে একটা সাইকেল গ্যারেজে কাম করি। খাইয়া পিন্দা বাঁচনডাই আমার লাইগা অনেক কষ্টের। পোলায় বাজারো টিভিতে মেসির খেলা দেইখা অহন তারও মেসি হওনের শখ। ওর আগ্রহের কারণে সকাল সকাল আমি ঘুম থেকে উইটা বাড়ির সামনের রাস্তার মধ্যে প্রতিদিন একঘণ্টা কইরা প্র্যাকটিস করাই। ছোটবেলায় আমারও ফুটবলের প্রতি অনেক নেশা আছিলো। কিন্তু আমার ফুটবল নেশা থাকলেও পোলায় একটা বড় ফুটবল পাগল। পোলার ফুটবল প্র্যাকটিস দেখতে প্রতিদিন মানুষ বাইত (বাড়িতে) ভিড় জমায়।’

নিজের অর্থাভাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এইসব দেইখা অহন আমারও শখ, পোলায় যেনো বড় হইয়া একজন বড় ফুটবলার অইতে পারে। আমি গরিব মানুষ, কেমতে কি করমু জানিনা। আমি গরিব মানুষ, পোলার স্বপ্ন কেমনে পূরণ করমু? তয়, সরকার যদি একটু দয়া করে, তয় আমার পোলা একদিন অবশ্যই জাতীয় দলে খেলব। একদিন উজ্জ্বল করবো সবার মুখ।’

স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক তাজুল ইসলাম শ্যামল জানায়, আমাদের বাড়ির সামনে খুদে মেসি খ্যাত সোহানের ক্রিয়াশৈলী সত্যিই চমৎকার। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সোহানকে দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ভালো কিছু করা সম্ভব।

প্রতিবেশী দুলাল প্রধান জানায়, ‘আমাগো মেসির (সোহান) প্র্যাকটিস বা খেলা দেখতে প্রতিদিনই তার বাড়িতে অনেক মানুষ আইসা ভিড় জমায়। আমরা প্রত্যেকদিনই ওর ফ্যাক্টিস দেহি।’

উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড়দের বাছাই করে ভালো পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এমনিতেই আমরা কাজ করি। সাড়ে পাঁচানীতে স্থানীয় মেসি খ্যাত সোহানের কথা আমরা শুনেছি, ওকে নিয়ে ভালো কিছু করার চিন্তা রয়েছে।

ইত্তেফাক/এপি