ঝিনাইদহ সদর উপজেলার এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করিয়া যেই সংঘর্ষ সংঘটিত হইয়াছে, তাহা শুধু স্থানীয় অশান্তির চিত্র নহে-ইহা বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর অসুখের উপসর্গ। সংবাদমতে, ঐ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের পর হইতেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দানা বাঁধে। সভাপতি পদে কে থাকিবেন, কমিটি কার প্রভাবে চলিবে-ইহাকে কেন্দ্র করিয়া দুই পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়াইয়া পড়ে। ফলাফল-বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে সংঘর্ষ, অন্তত ১৫ জন আহত, এমনকি হাসপাতালে গিয়াও পুনরায় মারামারি। প্রশ্ন জাগে-বিদ্যালয় কি রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধের ক্ষেত্র, নাকি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পবিত্র প্রতিষ্ঠান?
আমরা মনে করি, একটি বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটি থাকিবে-ইহা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সেই কমিটির সদস্য নির্বাচনেও গণতান্ত্রিক চর্চা থাকা চাই, যাহাতে স্বজনপ্রীতি বা চাপের পরিবর্তে গ্রহণযোগ্যতা অনুসারে সদস্যপদ নির্ধারিত হয়। কিন্তু সেই কমিটির মূল কাজ কী-তাহা কি আমরা ভুলিয়া যাই? প্রবিধানমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ, বাজেট অনুমোদন, শিক্ষক নিয়োগ, বেতন প্রদান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ-এই সকলই কমিটির দায়িত্ব। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের তদন্ত রিপোর্ট বলিতেছে, অধিকাংশ কমিটি এই দায়িত্বগুলির একটি ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তহবিল আত্মসাৎ, ভুয়া বিল প্রদান, নিয়োগে অর্থ লেনদেন ইত্যাদির অভিযোগই বেশি শুনা যায়।
এমনিতেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান ইতিমধ্যেই ক্রমাবনতিশীল। আন্তর্জাতিক র্যাংকিং হইতে শুরু করিয়া স্থানীয় পরীক্ষার ফলাফলের মান-সকলখানেই অবনতির চিত্র দিনদিন প্রকট হইতেছে। পাঠ্যপুস্তকের মান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পদ্ধতি-সকলখানেই ঘাটতি। এই সংকটের সহিত যদি যোগ হয় ম্যানেজিং কমিটিকে কেন্দ্র করিয়া রাজনৈতিক সংঘর্ষ, তাহা হইলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হইয়া যাওয়া অবশ্যম্ভাবী। যে পরিবেশে শিক্ষার্থী ভীত, শিক্ষকরা বিভক্ত, আর অভিভাবক হতাশ-সেইখানে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান কী করিয়া সম্ভবপর হইবে?
একটি বিদ্যালয়ের পরিবেশ কেবল শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নহে-ইহা মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তারও বিষয়। শিক্ষার্থীরা যদি বিদ্যালয়ের আঙিনায় শিক্ষক বা অভিভাবকদের হাতাহাতি, কাদা ছোড়াছুড়ি, কিংবা পুলিশ মোতায়েনের দৃশ্য দেখিয়া বড় হয়, তাহা হইলে তাহাদের মনে শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা কীভাবে গড়িয়া উঠিবে? বিদ্যালয় তখন কেবল আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র হইয়া দাঁড়ায়, জ্ঞানের কেন্দ্র নহে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নহে, বরং নূতন প্রজন্মের মানসিক বিকাশই বাধাগ্রস্ত হইবে।
এইখানে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ-সরকার যেহেতু এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের শতভাগ বেতন-ভাতা, অবকাঠামো নির্মাণ, আসবাবপত্র, পাঠ্যবই ইত্যাদি বহন করে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাহিলে সরাসরি এই বিদ্যালয়গুলি পরিচালনার সক্ষমতা রাখে। প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষা অফিসার রহিয়াছেন, সরকারি বিদ্যালয়ে ডিসির নেতৃত্বে মনিটরিং কমিটি আছে। তবে আমাদের স্পষ্ট কথা-কমিটির সদস্য হইবার লক্ষ্য যেন ব্যক্তিগত প্রভাব বা আর্থিক স্বার্থ না হয়, বরং বিদ্যালয়ের উন্নয়নই হউক তাহাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আর এই কমিটির নির্বাচন হউক এমনভাবে, যেইখানে যোগ্যতা, সততা, ও শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতাই প্রধান যোগ্যতা হয়।
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নহে-ইহা নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষাও প্রদান করে। বিদ্যালয়ের ভেতরে যদি অবিরাম কলহ, দোষারোপ, ও সংঘর্ষ চলমান থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা কোথায় মিলিবে? একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তাহার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানের উপর। সেই মান রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকার বা শিক্ষকের নহে-ম্যানেজিং কমিটিও এই দায়িত্বে সমানভাবে বাধ্য। এই সত্য যতদিন সকল পক্ষ উপলব্ধি করিতে না পারিবে, ততদিন প্রায়শই বিদ্যালয়ের আঙিনা হইয়া উঠিবে রাজনীতির রণক্ষেত্র। ইহার সমাধান জরুরি।
