গণপিটুনিতে মৃত্যু ও আইনের শাসনের অভাব

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৩০

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর গ্রামে মর্মান্তিক এক ঘটনা ঘটিয়াছে গত শনিবার রাত্রে। এই রাত্রে গণপিটুনিতে নিহত হইয়াছেন রূপলাল দাস এবং তাহার ভাগনির স্বামী প্রদীপ দাস। ইহা লইয়া তাহাদের পরিবারে এখন চলিতেছে মাতম। তাহাদের পরিবারের সদস্যদের একটাই প্রশ্ন, তাহাদের দোষ কী? রূপলাল দাস ছিলেন একজন মুচি; জুতা সেলাইকারী। আর প্রদীপ দাস ছিলেন ভ্যানচালক। যখন এক তরুণের সহিত রূপলাল দাসের মেয়ের বিবাহের কথাবার্তা চলিতেছিল, তখনই তাহাদের ভ্যানচোর বলিয়া গণপিটুনি দেওয়া হইয়াছে। গত ২৮ জুলাই ঐ এলাকায় এক শিশুকে হত্যা করিয়া একটি ভ্যান চুরির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজন পূর্ব হইতেই সংক্ষুব্ধ ছিলেন; কিন্তু আইনের আশ্রয় না লইয়া এবং কেবল সন্দেহবশত এইভাবে কাহাকে গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যা করিবার ঘটনায় প্রমাণিত হয়, আমরা আসলে কোন দেশে বসবাস করিতেছি? ইহা কি মগের বা মবের মুল্লুক নহে? ইহা কীসের আলামত?

সম্প্রতিকালে দেশে 'মব' সৃষ্টি করিয়া গণপিটুনিতে মানুষ হত্যারও বেশ কিছু নজির সৃষ্টি হইয়াছে, যাহা দুঃখ ও আশঙ্কাজনক। সাধারণ মানুষও আজ সামান্যতেই উত্তেজিত হইয়া পড়িতেছে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা না থাকিবার কারণে আইন হাতে তুলিয়া নিতেছে। ইহার শিকার হইতেছে অনেক নিরীহ ও গোবেচারা মানুষও। এই ধরনের ঘটনা যেইখানেই ঘটুক না কেন, সঙ্গে সঙ্গে তাহা গুরুত্ব সহকারে আমলে লইয়া তদন্ত করিয়া দেখা প্রয়োজন। নতুবা এই ধরনের একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেশবাসীর মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে থাকিবে এবং দেশে আরো সামাজিক অশান্তি ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাইবে। সম্প্রতিকালে কুমিল্লার মুরাদনগরে একই পরিবারের তিন জনেক পিটাইয়া হত্যা করা, গাজীপুরে চুরির অপবাদ দিয়া কারখানার শ্রমিককে রশি দিয়া বাঁধিয়া পিটাইয়া হত্যা করা, মিরপুরে দুই যুবককে পিটাইয়া হত্যা করা ইত্যাদি ঘটনা মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করিয়াছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বা এইচআরএসএস বলিতেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট হইতে পরবর্তী ১০ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ১৪৩ জন। আর ২০১৫ সাল হইতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বৎসরে গণপিটুনির ১ হাজার ৯টি ঘটনায় কমপক্ষে নিহত হইয়াছে ৮১৬ জন; কিন্তু এই সকল গণপিটুনির বিচার হয় কদাচিৎ। সম্প্রতি গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিনকে যখন সকলের সম্মুখে এলোপাতাড়িভাবে কুপাইয়া হত্যা করা হয়, তখন উপস্থিত জনগণের অসহায়ত্বের বিষয়টিও ধরা পড়িয়াছে। এমনকি এই ক্ষেত্রে পুলিশের ব্যর্থতার কথাও আজ বলা হইতেছে। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পুলিশও অনেক সময় বিপদাপন্ন মানুষকে রক্ষায় আগাইয়া আসিতে সাহস পাইতেছে না। কেননা তাহারাও তো হত্যার শিকার হইয়াছে। আজ সকলের মনে ভয় হইল, তুহিনের ন্যায় তাহারাও হত্যার শিকার হইতে পারে এবং দুর্বৃত্তদের ইহাতে তেমন কিছুই হইবে না। তাহারা গ্রেফতার হইলেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়া আবার ঠিকই বাহির হইয়া আসিবে। উন্নয়নশীল দেশে কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতেছে, তাহা আমাদের ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা প্রয়োজন এবং আইনকানুন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা দূর করা আবশ্যক।

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে উন্নয়ন হয় নাই কিংবা আইনের শাসনের অভাব রহিয়াছে, তাহা খোদ আইজিপির বক্তব্যেই প্রমাণিত হয়। গতকাল ইত্তেফাকের এক খবরে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বৎসর অতিক্রান্ত হইলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারে নাই পুলিশ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গুরুত্বপূর্ণ এই বাহিনীতেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। খোদ তাহাদের মধ্যেই কাজ করিতেছে 'মব ভায়োলেন্সের ভয়'। ফলে তাহারা অন্যকে সহযোগিতা করিবেন কীভাবে? আবার তাহাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নানা সংকটও রহিয়াছে। সকল মিলাইয়া আমরা আজ বুঝিতে পারিতেছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, গণপিটুনিসহ বিভিন্ন অপরাধ বন্ধ করিতে হইলে পুলিশ বাহিনীকে আবার পূর্বের সক্ষমতার জায়গায় ফিরাইয়া আনিতে হইবে। তাহাদের মানসিকভাবেও অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন