ডিমেনশিয়া শুধু ব্যক্তির নহে, জাতির জন্যও বিপজ্জনক

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৩০

সমুদ্রের ঢেউ যেমন উপকূলের বালুকাবেলায় শত চিহ্ন আঁকে, আবার পরমুহূর্তেই মুছিয়া ফেলে-মানুষের স্মৃতি ঠিক তেমনি, আঁকে ও মুছিয়া ফেলে। কিন্তু পার্থক্য এই যে, সমুদ্রের বিস্মৃতি প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্র, অথচ মানুষের বিস্মৃতি অনেক সময় আত্মবিনাশের সূচনা। এক ব্যক্তি যখন নিজের জীবনের গল্প ভুলিয়া যায়, তখন সে নিজেরই মধ্যে এক অচেনা মানুষে পরিণত হয়। কিন্তু যখন একটি জাতি তার অতীত ভুলিয়া যায়-তখন সে এক অচেনা জাতিতে রূপ নেয়, যাহার পথ, দিক ও ভবিষ্যৎ-সবই ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন।

মানুষের স্মৃতিশক্তি বিধাতার অন্যতম বিস্ময়কর দান। ইহার দ্বারাই ব্যক্তি নিজের অতীতের অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয়, শিক্ষা ও প্রজ্ঞাকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করিয়া ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করে। বয়স যত বৃদ্ধি পায়, এই স্মৃতির ভান্ডার ততই সমৃদ্ধ হয়; এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোয় মানুষ অধিক প্রজ্ঞাবান হয়। এই কারণেই চল্লিশের পরে মানুষকে বিচার করা হয় মূলত তাহার সঞ্চিত কর্মঅভিজ্ঞতার দ্বারা। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি ক্রমশ স্মৃতিশক্তি হারাইতে থাকে, তখন তাহার জীবন যেন ধীরে ধীরে অচেনা এক অন্ধকারে ডুবিয়া যায়- যেইখান হইতে প্রত্যাবর্তন দুরূহ। ডিমেনশিয়া এই বিস্মৃতির ভয়ংকরতম রূপ। ইহার প্রথম পর্যায়ে দেখা যায়-চেনা মানুষ চিনিতে না পারা, পরিচিত স্থান ভুলিয়া যাওয়া, কথা বলিতে খেই হারানো, কিংবা জিনিসপত্র ভুল জায়গায় রাখা। আলঝাইমার্সে আক্রান্ত কেউ কেউ অবচেতনে মনগড়া গল্প বানান-নিজের স্মৃতির ঘাটতি ঢাকিবার জন্য। একসময় এই রোগ এমন গভীরে পৌঁছায় যে, নিজের আত্মীয়স্বজনের নামও অস্পষ্ট হয়ে যায়; এমনকি নিজের নামটিও ভুলিয়া যান।

কিন্তু ভয়ংকর প্রশ্নটি এইখানে-এই স্মৃতিভ্রংশ কি কেবল ব্যক্তির রোগ? নাকি জাতিও এর শিকার হইতে পারে? ইতিহাসের দিকে তাকাইলে উত্তরটি স্পষ্ট-জাতিও স্মৃতি হারাইতে পারে। ইতিহাসে বহু সভ্যতা এই রোগে আক্রান্ত হইয়া বিলীন হইয়াছে। রোমান সাম্রাজ্যের পতন শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দুর্বলতার ফল নহে; বরং অতীতের প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সেনেটের মর্যাদা, এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ ভুলিয়া যাওয়ার পরিণাম। মায়া সভ্যতা পরিবেশ ও কৃষি-ব্যবস্থার বিপর্যয় হইতে শিক্ষা লইতে ব্যর্থ হইয়াছিল-কারণ তারা পূর্ববর্তী বিপর্যয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ করে নাই। প্রাচীন পারস্যে সাইরাস দ্য গ্রেটের ন্যায়বিচারের নীতি ধীরে ধীরে বিস্মৃত হইয়া যায়, এবং স্বৈরতন্ত্রে অভ্যস্ত হইয়া পড়া একসময় সাম্রাজ্যকে দুর্বল করিয়া তোলে। এই জন্য মিলান কুন্দেরা সতর্ক করিয়াছিলেন- 'জাতির স্মৃতি ধ্বংস করা মানে তাহার পরিচয় ধ্বংস করা।' আর জর্জ অরওয়েল বলিয়াছেন-'যে অতীত নিয়ন্ত্রণ করে, সে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে; যে বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করে, সে অতীত নিয়ন্ত্রণ করে।' এই উক্তিগুলি শুধু দার্শনিক সতর্কবাণী নহে-সভ্যতার ইতিহাসের কঠিন সত্য।

জাতির জন্য স্মৃতি শুধু গৌরবের গল্প নহে-এটি সতর্কবার্তার ভান্ডার। প্রাচীন অ্যাথেন্স বারবার নিজেদের গণতন্ত্র হারাইয়া ফেলিয়াছিল, কারণ তাহারা পূর্ববর্তী দমননীতির স্মৃতি যথাযথভাবে ধারণ করে নাই। ইউরোপের বহু রাষ্ট্র বিংশ শতাব্দীতে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের ফাঁদে পড়িয়াছিল, যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাহাদের সামনে ছিল সেই ধ্বংসের তাজা স্মৃতি। বিস্মৃতির এই প্রবণতাই অরওয়েলের ভয়কে বাস্তবে রূপ দিয়াছিল।

ব্যক্তিগত ডিমেনশিয়ার চিকিৎসায় যেমন প্রাথমিক পর্যায়ে সতর্কতা, মস্তিষ্কচর্চা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও পরিবার-সমাজের স্নেহ প্রয়োজন; তেমনই জাতিগত স্মৃতিরক্ষার জন্য প্রয়োজন সত্যিকার ইতিহাস শিক্ষা, দলমতনিরপেক্ষভাবে অতীতের ভুলের স্বীকৃতি, এবং সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা। কারণ ব্যক্তি যখন স্মৃতি হারায়, তাহার চারিপার্শ্বের পরিবার শোকে বিপর্যস্ত হয়; কিন্তু জাতি যখন স্মৃতি হারায়, তখন পুরো জাতিই দিকহীন হইয়া পড়ে। ভুলের পুনরাবৃত্তি তখন শুধু সম্ভাবনা নহে-অপরিহার্য হইয়া উঠে।

অতএব, স্মৃতি রক্ষা করা মানে কেবল অতীতকে আঁকড়াইয়া ধরা নহে, বরং ভবিষ্যতের জন্য বাঁচিয়া থাকার উপায় নিশ্চিত করা। ব্যক্তি যেমন নিজের পরিচয় হারাইতে চাহে না, তেমনই জাতিও তাহার অতীতের সত্য হারাইলে নিজের অস্তিত্ব হারায়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন