ক্রিয়েটিভ স্পেস, ধানসিঁড়ি কমিউনিকেশন এবং ডিপার্টমেন্ট এস কনসালটিং। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী প্রান্তিক ভবনের দ্বিতীয় তলার বহির্গমন এলাকায় অবস্থিত ফ্যালকন এজেন্সি এবং নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ বহির্গমন এলাকায় কার্যক্রমরত ফ্যালকন এয়ারপোর্ট সার্ভিস টিমের ইজারাও নবায়ন করা হয়নি।
আকস্মিক নয় কস্মিক নয়; জেনেবুঝে, পর্যাপ্ত তথ্যদৃষ্টেই ঢাকাসহ দেশের তিনটি বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে ১৬টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচকের এমন সিদ্ধান্ত আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল। এতে আপাতত বিমানবন্দর দুষ্টচক্রের রাহুমুক্ত হয়েছে। তবে থামেনি ষড়যন্ত্র: চলছে চক্রটির নানা অপতৎপরতা। চক্র শক্তিশালী করতে হায়ার করেছে কিছু তদবিরবাজসহ নতুন প্লেয়ার। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছড়াচ্ছে নানা অপতথ্য।
ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যেসব প্রতিষ্ঠানের ইজারার মেয়াদ ৩০ জুন মধ্যরাতে শেষ হয়েছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের ইজারা নবায়ন করা হয়নি সেগুলো হলো-এরোস ট্রেডিং, মেসার্স সজল এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মাহবুবা ট্রেডার্স, নাহার কনস্ট্রাকশন, এভিয়েশন ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড, এ ফাইভ রোডওয়ে লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড ট্রাস্ট ট্যুরিস্ট কার সার্ভিসেস কোং, শিরিন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স হাওলাদার অ্যান্ড সন্স, মেসার্স অথৈ এন্টারপ্রাইজ, ওলফ করপোরেশন, আড়িয়াল এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৯ জুন রেজিস্টার্ড ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা শেষে এসব প্রতিষ্ঠানকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলতে হবে এবং নবায়নের জন্য কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ-যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। মনোপলি করা এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর এক ধরনের দস্যুতা করে চলছিল বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে। একাধিক বার ইজারা নবায়নের সুযোগ পেলেও তারা যাত্রীসেবা নিশ্চিতের দিকে যায়নি। ব্যস্ত থেকেছে অন্য নানান কিছুতে। কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে বাণিজ্যিক স্বার্থে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরিসহ নানা অপকর্ম চালিয়েছে। কাউকে পরোয়া করা বা নিয়মনীতি মানার দরকারই বোধ করেনি তারা।
এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই বিগত সরকারপন্থি বিভিন্ন লীগের নাম ভাঙিয়েছে। পেয়েছে রাজনৈতিক নেতা বা তাদের ঘনিষ্ঠদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদত। এতে তারা বছরে পর বছর ধরে বিমানবন্দরের ভেতরে তৈরি করে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য। তাদের কেউ কেউ বর্তমানে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় কারাবন্দি। কেউ কেউ দেশের বাইরে পলাতক। আর কিছুসংখ্যক রয়েছে দেশে গা ঢাকা দিয়ে। এর মধ্যেই আবার পুরোনো একটি চক্র নতুনরূপে আবির্ভূত হয়েছে। তারা পূর্ববর্তী সরকারের রাজনৈতিক বলয় পুনর্গঠন ও নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারে লিপ্ত হয়েছে। ছড়াচ্ছে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য। বেবিচকের পেশাদার-সাহসী কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পয়দা করে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। হাইপ তুলতে চাইছে স্যোশাল মিডিয়ায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এখন সময় এসেছে রাহুমুক্ত হয়ে একটি আধুনিক, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক বিমানবন্দর পরিবেশ আনার।
কাজটি বেশ কঠিন। দীর্ঘদিন জেঁকে বসা শক্তিধর চক্রটিকে রুখে দিয়ে নতুন বন্দোবস্ত আনা কঠিনেরও কঠিন; সময়সাপেক্ষও। বিমানবন্দর রাহুমুক্ত হয়ে গেছে মনে করা ঠিক হবে না। চক্র দমবে না। তাদের ষড়যন্ত্র, কারসাজি থামবে না। এক্ষেত্রে বেবিচক কর্তৃপক্ষকে কঠোর অবস্থানে অটল থাকতে হবে। বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত থেকে কর্তৃপক্ষ পিছু হটলে চক্রটি আরো ব্যাপক উদ্যমে পেয়ে বসবে। মনে রাখতে হবে, বিমানবন্দরের মান ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা একটি আন্তর্জাতিক ব্যাপারও। বিশ্বের কয়েকটি দেশই বাংলাদেশের বিমানবন্দরের মতো এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। সমাধানও করেছে।
পারে। আলোচনা দূরে থাক, একসময় তো এ নিয়ে কথাই বলা যায়নি। পরবর্তীকালে সময়টাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে এ ব্যাপারে নানামুখী চিন্তা, আলোচনা, অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। সেসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও সক্ষমতা আরো বৃদ্ধির চিন্তাও রাখতে হবে। সময়ের চাহিদার আলোকে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং সিস্টেম জোরদার করতে হবে। প্রতিটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের লেনদেন, হলঃ পংজাবার অতর্জাতিক বিমানবন্দর ঢাকা সিংগাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দর বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলেও পারফরম্যান্স-বেইজড কন্ট্রাক্ট অনুসরণ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাত্রী সন্তুষ্টি, সময়মতো সেবা এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণের নির্দিষ্ট স্কোর অর্জন করতে হয়। না পারলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। লন্ডন হিথরোতে নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা কমপ্লায়েন্স অডিটের মাধ্যমে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মূল্যায়ন হয়। সবকিছু ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত, যা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও অ্যাক্সেস থাকে। এতে অনিয়ম লুকানো প্রায় অসম্ভব।
দোহা হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম ইন্টিগ্রেটেড অপারেশন সেন্টারের নজরদারিতে থাকে। অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি অনলাইন ও স্বচ্ছ, যেখানে যাত্রী ফিডব্যাক সরাসরি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। খাটে না মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাব। বাংলাদেশকে সিংগাপুর, হিথরো বা দোহার মতোই করতে হবে, তা নয়। বাংলাদেশ বাংলাদেশের পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা-বাস্তবতা মতোই সিদ্ধান্ত নেবে। তার পরও করণীয় হিসেবে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক চুক্তি প্রবর্তন করতে পারে। নতুন করে যে কোনো বাণিজ্যিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে পারফরম্যান্স স্কোরের ভিত্তিতে চুক্তি নবায়ন করতে হবে। যাত্রী সন্তুষ্টি, নিরাপত্তা কমপ্লায়েন্স ও সময়মতো সেবা প্রদানের পরিমাপযোগ্য সূচক অবশ্যই থাকতে হবে। অবস্থা বিবেচনায় স্বাধীন তদারকি বোর্ড গঠনের কথাও ভাবা যায়। কোনো ভাবনাই চূড়ান্ত নয়। সময় বিবেচনায় নানা আলোচনাই হতে অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ ও কর্মক্ষমতা তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে সংযুক্ত করা যায়, যেন রিয়েল-টাইমে মনিটরিং করা যায়। যাত্রী ফিডব্যাক বাধ্যতামূলক করতেই হবে। চুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করতে হবে যে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবশালী সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়।
মনে রাখতেই হবে, বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়-এটি একটি দেশের ভাবমূর্তির প্রতিচ্ছবি। পুরোনো রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি একটি বড় পদক্ষেপ, তবে এটিকে স্থায়ী ও কার্যকর করতে হলে দরকার আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক উদাহরণ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে-যেখানে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও পারফরম্যান্সকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সেখানেই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছায়। বাংলাদেশও সেই পথেই এগোতে পারে, যদি ইচ্ছাশক্তি ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এরই মধ্যে দশ কাজের এক কাজের মতো দুষ্টদের বড় একটা অংশকে দমানো হয়েছে। বেশ বড় কাজ এটি। দীর্ঘদিনের মনোপলি ভেঙে দেওয়ায় এদের ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। এরা নানা ষড়যন্ত্র করবে, তাও স্বাভাবিক। এরই মধ্যে তারা তা পুরোদমেই করছে, আরো করবে। এতে কোনোক্রমেই নমনীয় হওয়া যাবে না। নমনীয় হওয়া মানেই দুষ্টচক্রের জয়। আবার তাদের চেপে বসার সুযোগ। আর বেবিচক কর্তৃপক্ষের মহাপরাজয়। তা বর্তমানের জন্য, ভবিষ্যতের জন্যও।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
