‘মেয়ে বলে মা কোচিং না করলে মিস আদর করে না। তাই আমি মেয়েকে কোচিংয়ে দিলাম। কোচিংয়ের কারণে আমার মেয়ে মারা গেল, হারালাম কলিজার ধন। এই কোচিং মেয়ের সর্বনাশ করল।’ কথাগুলো বলছিলেন গত ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে নিহত তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সায়মা আক্তারের মা রীনা আক্তার। গতকাল মঙ্গলবার দিয়াবাড়ী গোলচত্বরে তার সঙ্গে কথা হয়। রীনা আক্তারের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ ছিল ‘আমার মেয়ে আর আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে না, এই কষ্ট আমি কীভাবে সহ্য করব? মনটা যখন খুব ভারী হয়ে ওঠে, কারও সঙ্গে কথা কই না। চলে যাই মেয়ের কবরে। মাথার কাছে বসে মনের সব কথা কই। চোখের পানি ফেলি। ঘণ্টা দেড়েক পরে মনটা হালকা হলে বাড়ি ফিরি।’
এদিকে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার দিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানোসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছেন রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবকরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে দিয়াবাড়ী গোলচত্বরে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধনকালে এসব দাবি জানান। এ সময় তাদের হাতে ছিল সন্তানের ছবিযুক্ত প্ল্যাকার্ড, চোখে অশ্রু।
গত ১১ মার্চ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক আদেশ বলা হয়েছে, সারা দেশে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস শেষে ছুটির পর এবং বন্ধের দিনে শ্রেণিকক্ষে প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং করানো যাবে না। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসা নিষিদ্ধ করে ২০১২ সালে ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা’ জারি করে সরকার। ঐ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক ১০ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারেন। তবে ঐ শিক্ষার্থীদের নাম, রোল ও শ্রেণি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানাতে হবে। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে শ্রেণি কক্ষেই চলে কোচিং বাণিজ্য। গত ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রায় ১০ মিনিট আগেই মাইলস্টোন স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বেজেছিল। কিন্তু দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কাছে কোচিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী, আহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই জন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লাস রুমে কোচিং ক্লাস করে আসছেন এক শ্রেণির শিক্ষক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি আইন উপেক্ষা করে নিজেদের মতো নতুন আইন করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এখনকার শিক্ষকদের বাসায় কিংবা অন্য কোথায় কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে শিক্ষকরা চাইলে বিদ্যালয়ে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারেন। মাইলস্টোনের সবগুলো শাখা একই নিয়মে পরিচালিত হয়। মাইলস্টোনে স্কুল পর্যায়ে ছুটি হয় দুপুর ১টার দিকে। আর কলেজ পর্যায়ে ছুটি হয় ১টা ৪০ মিনিটে। স্কুলের কোচিং শুরু হয় দেড়টায় আর কলেজের ২টা থেকে। আহত এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার ভাতিজা কোচিং করতে অপেক্ষা করছিল। ওর ছুটি হয়েছিল ১টায়। তবে শিক্ষকরা স্কুলে কোচিং নেওয়ায় সে ভেতরেই ছিল। কোচিং বাধ্যতামূলক না হলে আমার সন্তান আহত হতো না।’
অভিভাবকদের ৯ দাবি: মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ৯ দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো ১) সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ২) সারা বাংলাদেশে মাইলস্টোন স্কুলসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। ৩) সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি নিহত শিশুর জন্য ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ (জরিমানা) এবং প্রত্যেক আহত শিক্ষার্থীদের জন্য ১ কোটি টাকা দিতে হবে। ৪) স্কুলের পক্ষ থেকে প্রত্যেক নিহত শিশুর জন্য ২ কোটি এবং প্রত্যেক আহত শিশুর জন্য ১ কোটি টাকা জরিমানা দিতে হবে। ৫) রানওয়ে থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন করতে হবে (অন্যথায় রানওয়ের স্থান পরিবর্তন করতে হবে)। ৬) কোচিং ব্যবসার মূল হোতা স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষিকাকে (মিস খাদিজা) ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। ৭) স্কুলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আমাদের দেখাতে হবে। ৮) বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জনহীন জায়গায় করতে হবে। ৯) মানববন্ধন করতে চাইলে কনক নামের এক শিক্ষক এক অভিভাবকের গায়ে হাত তোলেন। তাকে অপসারণ করতে হবে।
কোচিং না করলে মিসরা আদর করত না : মানববন্ধনে অংশ নিয়ে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী মারিয়াম উম্মে আফিয়ার মা উম্মে তামিমা আক্তার বলেন, ‘এখানে যে বাচ্চাগুলো মারা গেছে, সব কোচিংয়ের বাচ্চা। এ স্কুলে কোচিংয়ের জন্য যতটা প্রেশার দেওয়া হয়, আমার মনে হয় না, অন্য কোথাও এত প্রেশার দেওয়া হয়। পরীক্ষায় খারাপ করিয়ে কোচিংয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চাটাকে আমি কখনো কোচিংয়ে দিতাম না। আমার বাচ্চাটাকে দেড় মাস হয়েছে কোচিংয়ে দিসি। কেন দিয়েছি জানেন? আমার বাচ্চা বাসায় এসে আমাকে বলে, আম্মু আমি যদি কোচিং না করি, মিসরা আমাকে আদর করে না।’ আফিয়া স্কুলের বাংলা মাধ্যমের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। কোচিংয়ে দেওয়ার পর মেয়ে খুশি ছিল জানিয়ে তামিমা আক্তার বলেন, ‘যখন বাচ্চাটাকে কোচিংয়ে দিলাম, এক সপ্তাহ পর আমার ময়না পাখি, আমারে জড়াইয়া ধইরা বলে, মা মিসরা আমাকে এখন অনেক আদর করে।’
মানসিক টর্চার করে কোচিংয়ে দিতে বাধ্য করে: নিহত শিক্ষার্থী বোরহান উদ্দীন বাপ্পীর বাবা মোহাম্মদ আবু শাহীন বলেন, ‘শিক্ষকেরা বলে আপনার বাচ্চা ক্লাসে পড়া পারে না। আপনার ছেলের পড়াশোনা ভালো না। বিভিন্নভাবে মানসিক টর্চার করে, এভাবেই কোচিং করাতে বাধ্য করে।’ বাপ্পী স্কুলের বাংলা মিডিয়ামের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। বোরহান উদ্দীন বলেন, তার আরেক ছেলে বেলাল উদ্দীন স্কুলের প্লে শ্রেণিতে পড়ে। তাকেও কোচিংয়ে ভর্তি করাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ চাপ দিচ্ছে।
কোচিং ব্যবসার মূল হোতা স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষিকা: নামপ্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, স্কুল শাখার প্রধান খাদিজা মিস। তিনি কোচিং ব্যবসার মূল হোতা। নিহত মাহেরিন চৌধুরী মিস বারবার নিষেধ করেছেন, কিন্তু খাদিজা মিস শোনেননি। মাহেরীন মিসের সঙ্গে এ নিয়ে দ্বন্দ্বও ছিল তার। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোচিং ব্যবসার মূল হোতা খাদিজা মিসকে অপসারণ করতে হবে।
শিক্ষকের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা: মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবকরা বলেন, ‘আমরা মারামারি করতে আসিনি। এসেছিলাম মানববন্ধন করতে। স্কুল কর্তৃপক্ষ, একজন শিক্ষকও তো আমাদের কাছে আসেননি। আমরা তো সন্তানহারা অভিভাবক। কেউ তো এসে বললেন না, আসেন আপনাদের সঙ্গে কথা বলি।’ উলটো মানববন্ধনে আসা শিক্ষার্থীদের স্কুলে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অভিযোগ করে অভিভাবকরা বলেন, গতকাল মানববন্ধন করতে গেলে মাইলস্টোনের একজন শিক্ষকের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ঐ শিক্ষক একজন অভিভাবকের গায়ে হাত তোলেন। এ জন্য লিখিত আট দফার সঙ্গে তারা আরও এক দফা যুক্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষকের অপসারণ দাবি করেন। মানববন্ধনে অভিভাবকরা ‘কোচিংয়ের নামে ব্যবসা, বন্ধ কর, বন্ধ কর’, ‘ফুল-পাখি সব পুড়ল কেন, জবাব চাই, দিতে হবে’, ‘কী এসেছে কী এসেছে, বিমান এসেছে, বিমান এসেছে, কী করেছে কী করেছে, মায়ের বুক খালি করেছে’, ‘শিক্ষা না ব্যবসা, শিক্ষা-শিক্ষা’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।

