সমাজের এই হাল কেন তৈরি হইল?

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫, ০৫:০০

রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যান চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে দুই ব্যক্তির হত্যার ঘটনা জাতিকে স্তম্ভিত করিয়াছে। এই নৃশংসতায় বিস্মিত ও বিচলিত বিবেকবান মানুষ। ইতিমধ্যে তাহাদের গণপিটুনি দিয়া হত্যার সময়কার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। সৃষ্টির সেরা মানুষের যখন পদস্খলন ঘটে, তখন তাহারা কতটা নিচু স্তরে নামিয়া যাইতে পারে, এই ঘটনা তাহার অন্যতম প্রমাণবহ। ভিডিওতে দেখা যায়, ভীতসন্ত্রস্ত ঐ দুই ব্যক্তি তাহাদের প্রাণে না মারিবার জন্য হাতজোড় করিয়া কাকুতিমিনতি করিতেছেন। প্রয়োজনে তাহাদের সেনাবাহিনী বা পুলিশের হস্তে তুলিয়া দেওয়ার জন্য বারংবার অনুরোধ করিতেছেন। কিন্তু নরপশু ও পিশাচদের ইহাতে কী আসে-যায়?

বলা হইতেছে, গত ২৮ জুলাই ঐ এলাকায় এক শিশুকে হত্যা করিয়া একটি ভ্যান চুরির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজন ইহাতে আগে হইতেই সংক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু তাহারা যতই সংক্ষুব্ধ থাকুক না কেন, কেহ আইন নিজের হস্তে তুলিয়া নিতে পারে না। আইনের আশ্রয় না লইয়া কেবল সন্দেহবশত এইভাবে নৃশংস কায়দায় কাহাকে হত্যা করা যায়, তাহা ভাবিলেও শরীর শিহরিত হইয়া উঠে। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে একটি স্বাধীন দেশে প্রত্যেক নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা পাইবার অধিকার সহজাত। অবশ্য এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতিমধ্যে চার জনকে গ্রেফতার করিয়াছে। আমরা মনে করি, গণপিটুনির ঘটনা যেইখানেই ঘটুক না কেন, সঙ্গে সঙ্গে ইহা প্রতিরোধ করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের ঘটনা ইদানীংকালে যেইভাবে বাড়িয়া গিয়াছে, তাহা উদ্বেগজনক। ইহা আইনের শাসনের পরিপন্থি এবং আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থারও একপ্রকার বহিঃপ্রকাশ বটে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বৎসর জানুয়ারি হইতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের শিকার হইয়া নিহত হইয়াছেন ১১১ জন। এই ধরনের ধারাবাহিক ঘটনা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি জনমনে ভীতির সঞ্চার করিয়াছে। ইহা সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষুণ্ণ করিতেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বা এইচআরএসএস বলিতেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট হইতে পরবর্তী ১০ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ১৪৩ জন। আর ২০১৫ হইতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বৎসরে গণপিটুনির ১ হাজার ৯টি ঘটনায় কমপক্ষে নিহত হইয়াছে ৮১৬ জন। কিন্তু এই সকল গণপিটুনির বিচার হয় কদাচিৎ। আরো উদ্বেগের বিষয় হইল, এইরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে বিবেকবান সাধারণ জনগণের প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, অনেক সময় তাহাদের অসহায়ত্বের বিষয়টি প্রতিভাত হইয়া উঠে। এমনকি উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বিপদাপন্ন মানুষকে রক্ষায় আগাইয়া আসিতে সাহস পান না। কেননা তাহাদের মধ্যেও অনেকের ট্রমা দূর হয় নাই। 'মব ভায়োলেন্সের ভয়' তাহাদের অনেকের মনে গাঁথিয়া রহিয়াছে।

সম্প্রতি দেশে গণপিটুনি ও 'মব' সন্ত্রাসের এই সকল ঘটনা সত্যি দুঃখজনক। এই সকল বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়াও আমরা বুঝিতে পারি, আমরা আজ কোথায় বসবাস করিতেছি ও অমানববিকতার কোন পর্যায়ে উপনীত হইয়াছি। এই সকল ঘটনার সামাজিক ও মানসিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করিতে গেলে আমাদের আরো হতাশ হইতে হয়। এইখানে একটাই প্রশ্ন উঠে, আমাদের সমাজের কেন এই হাল তৈরি হইল? সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্ষোভ, হতাশা, অশান্তি, অস্থিরতা ইত্যাদি আজও বিদ্যমান। তাহা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনভাবে শিকড় গাড়িয়া বসিয়াছে যে, তাহার ফলস্বরূপ আমাদের নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখিতে হইতেছে। ইহার জন্য দেশে আইনের শাসনের উন্নতি দরকার। দরকার আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থা লাভ। বলা বাহুল্য, এই জন্য আমাদের ধৈর্যধারণের প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন