বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের স্বার্থে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৫, ২০:২৮

দেশ জুড়ে অবৈধ তামাকপণ্য ও নিরাপদ বিকল্পের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ বর্তমানে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এক পক্ষ বাস্তবভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলোর চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব মডেলে স্বীকৃত যে, নিরাপদ বিকল্পের বাজার নিয়ন্ত্রণ মানে তা ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও বাজার বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে যুক্তিসঙ্গতভাবে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে এটি এমন ধূমপায়ীদের জন্য এক মধ্যপন্থা তৈরি করে দেয়, যারা ধূমপান ছাড়তে হিমশিম খাচ্ছেন; কেননা বর্তমান বিধিনিষেধে একমাত্র পথ হচ্ছে, ধূমপান ছাড়ুন অথবা মৃত্যুর ঝুঁকি নিন। 

অন্যদিকে, বিপরীত মত-পোষণকারী একটি পক্ষ যারা সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুপ্রাণিত এবং গোপন উদ্দেশ্য সম্পন্ন বিদেশি অর্থায়িত সংগঠনের সমর্থনপুষ্ট যারা স্থানীয় বাস্তবতা ও বিশ্বজুড়ে এই নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর নেতিবাচক অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে নিরাপদ বিকল্পের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য নীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গঠনের অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোঃ আবদুর রহমান খানের দেওয়া বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি উল্লেখ করেন, অবৈধ তামাকপণ্য ও নিরাপদ বিকল্পের বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। যদিও তিনি নিরাপদ বিকল্পের নিয়ন্ত্রণহীন প্রচারের পক্ষে ছিলেন না, তবুও তিনি সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত নীতির ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ভোক্তাদেরকে অনিয়ন্ত্রিত কালোবাজারের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সরকার রাজস্ব হারায় এবং মানুষ আরও ক্ষতিকর পণ্যের ঝুঁকিতে পড়ে যেমনটি ঘটেছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডে। তাঁর মন্তব্যের মূল ভাবনা ছিল, কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা বা বাজারে বিকল্প না থাকলে নিষেধাজ্ঞা চাহিদা কমায় না; বরং তা বিপজ্জনক, অনিয়ন্ত্রিত বাজারে সরিয়ে দেয়, যা দেশ ও জনগণের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর এই অবস্থান এবং যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তিনি তা উপস্থাপন করেছেন, তা বিকৃত করে উপস্থাপন করছে বিরোধী পক্ষ, যার নেতৃত্বে রয়েছে কিছু অ্যান্টি-টোবাকো এনজিও।

বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর সদস্য দেশ। এই আন্তর্জাতিক চুক্তি সরকারকে তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি তৈরি করতে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। অনেকের ধারণা, এফসিটিসির অনুচ্ছেদ ৫.৩ সরকারি কর্মকর্তাদের শিল্প প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেয়। আসলে তা নয়, এই অনুচ্ছেদ শুধু বলে, এমন যোগাযোগ উন্মুক্তভাবে করতে হবে এবং যেন জনস্বাস্থ্য নীতিতে কোনো ভুল প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, নির্দেশিকার অনুচ্ছেদ ১(ডি)-তে বলা হয়েছে তামাক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ক্ষতি কমানোর কৌশলও রয়েছে। তাই সরকারকে শিল্পসহ সব পক্ষকে স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে আলোচনায় যুক্ত করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কম ঝুঁকিপূর্ণ নতুন তামাক বিকল্পের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিলে এফসিটিসির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এতে জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও ভোক্তার আচরণ দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখে নীতি তৈরির সুযোগ নষ্ট হয়। বাস্তবে, অনুচ্ছেদ ১(ডি)-তে যে নিরাপদ বিকল্পের কথা বলা হয়েছে, তা আজ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে চালু আছে। তাই বাংলাদেশকে এফসিটিসি মানতে হলে এই অনুচ্ছেদও গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, নিরাপদ বিকল্প পণ্যের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই এসব পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যেমন, বেলজিয়াম তরুণদের ব্যবহার কমাতে ই-সিগারেটে ফ্লেভার নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। এভাবে তারা বুঝিয়েছে, কিছু ধূমপায়ী সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা করলে এসব বিকল্প তাদের সহায়তা করতে পারে, তাই এগুলো বন্ধ না করে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই ভালো।

একইভাবে, থাইল্যান্ডে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেও অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা যায়নি। এতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে নিয়ন্ত্রণ নীতি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। কয়েক মাস আগে গঠিত একটি পর্যালোচনা কমিটিও ভোট দিয়ে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ভেপিংয়ের জন্য শুধু প্রেসক্রিপশন-ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করায় অবৈধ বিক্রি বেড়ে গেছে এবং আইন প্রয়োগে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, ফলে নীতিনির্ধারকরা নিষেধাজ্ঞা কৌশল নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। আর ভারতের ২০১৯ সালের ভেপ নিষেধাজ্ঞা তরুণদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে করা হলেও, তা উল্টো একটি সক্রিয় আন্ডারগ্রাউন্ড বাজারকে আরও শক্তিশালী করেছে, যেখানে ১০ কোটিরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত বিকল্প থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং কার্যকর ক্ষতি-হ্রাস কৌশল থেকেও বাকি রয়েছেন।

একইভাবে, থাইল্যান্ডে ই-সিগারেটের ওপর কড়া দমননীতি অবৈধ বাণিজ্য থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে নীতি সংস্কারের আহ্বান জানাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ায় ভেপিংয়ের জন্য কেবল প্রেসক্রিপশন-ভিত্তিক মডেল চালু করা হলেও এতে অবৈধ বিক্রি ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং আইন প্রয়োগকারীরা চাপের মুখে পড়েছেন, যার ফলে নীতিনির্ধারকরা নিষেধাজ্ঞা কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে, ভারতের ২০১৯ সালের ভেপ নিষেধাজ্ঞা তরুণদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে করা হলেও তা কেবল একটি সক্রিয় আন্ডারগ্রাউন্ড বাজারকে উসকে দিয়েছে, যেখানে ২৬ কোটিরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহারকারী নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত বিকল্প থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং কার্যকর ক্ষতি-হ্রাস কৌশল থেকেও দূরে রয়েছেন।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে যে, নিষেধাজ্ঞা সমস্যাকে সমাধান না করে বরং আরও জটিল করে তোলে। অবৈধ বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিষেধাজ্ঞার চেয়ে নিয়ন্ত্রণই বেশি কার্যকর কৌশল। কারণ, সার্বিক নিষেধাজ্ঞা বৈধ ভোক্তাদেরকে অবৈধ বা কালোবাজারের দিকে ঠেলে দেয়, এতে সরকার রাজস্ব হারায় এবং ভোক্তার সুরক্ষার জন্য থাকা মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকার পণ্যের মান বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং শিশু ও তরুণদের সুরক্ষায় বয়সসীমা কার্যকর করার সুযোগ পায়। অর্থনৈতিক দিক থেকেও অবৈধ বাণিজ্যের বাস্তবতা স্বীকার করা মানে তামাক ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং এটি এমন বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নীতি তৈরির অংশ, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি কমায় এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করে।

তবুও, যারা নিয়ন্ত্রণ নীতির বিরোধিতা করে এবং সার্বিক নিষেধাজ্ঞার পক্ষে আলোচনা করে, তারা এ ধরনের চরম অবস্থানকে ন্যায্যতা দিতে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর কথা তুলে ধরে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নে অংশ নিতে অনীহা দেখায়। অথচ তারা খুব কমই এফসিটিসির প্রকৃত ধারা উল্লেখ করে, বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ১(ডি), যেখানে স্পষ্টভাবে ক্ষতি হ্রাস কৌশলকে সমন্বিত তামাক নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রচলিত বার্তা মূলত ‘ছাড়ো অথবা মরো’- যা আসক্তির বাস্তবতা এবং ক্ষতিকর তামাক ব্যবহার থেকে মুক্ত হতে চাওয়া মানুষের মানবিক দিককে উপেক্ষা করে। এই গোষ্ঠীগুলো প্রায় পুরোপুরি ভেপিংকে কেবল তরুণদের সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে, অথচ তারা উপেক্ষা করে বাংলাদেশের কোটি কোটি প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীর জরুরি ও বাস্তব প্রয়োজন, যারা নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত বিকল্প পাওয়ার অধিকার রাখেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে নীতিগত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বুদ্ধিমান ও প্রমাণ ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নীতি, যা জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথও সুগম করে। অপরদিকে রয়েছে আদর্শবাদী কঠোরতা, বৈদেশিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, সার্বভৌমত্বের ক্ষতি এবং এমন আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই সংকটে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি প্রগতিশীল, বাস্তবসম্মত ও জনগণ কেন্দ্রিক কৌশল। এমন একটি নীতি যা ক্ষতি কমায়, আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করে, রাজস্ব হ্রাস পুনরুদ্ধার করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক ভোক্তাদের নিরাপদ বিকল্প পাওয়ার সুযোগ দেয়। আর এভাবেই একটি দেশ স্বাস্থ্যসম্মত ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

জিলফুল মুরাদ 
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এমএএস