বাংলাদেশের বৃহত্তম আবাসিক প্রকল্পের নাম রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প। একে ইংরেজিতে সংক্ষেপে বলা হয় রুয়াপ (আরইউএপি)। রুয়াপ বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি নিদর্শন। ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এই স্থানটি ঘুরে দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। হাতিরঝিলের পর এই প্রকল্প এলাকা এখন বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার মতো খোলামেলা পরিবেশ, বিল, লেকসহ মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের পাশাপাশি আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের এমন সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যা দেখে যে কারো অন্তর জুড়িয়ে যায়। এমন সুন্দর পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাজউক কর্তৃপক্ষকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।
এমন সুন্দর পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কতিপয় সমস্যার কারণে এখানে যারা ইতোমধ্যে বসবাস শুরু করেছেন তারা মোটেও স্বস্তিবোধ করছেন না। এখানে ১৬তলা বিশিষ্ট ৭৯টি ভবনে ছয় সহস্রাধিক ফ্ল্যাট নির্মিত হচ্ছে। অধিকাংশ ভবন ও ফ্ল্যাটের আভ্যন্তরীন কাজ বলতে গেলে সমাপ্ত। কিন্তু প্রকল্পটি উত্তরা ১২ নং সেক্টর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ১৮ নং সেক্টরে প্রায় জনবসতিহীন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় সন্ধ্যার পর এখানে ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রকল্পের ভেতরে ও বাইরে স্ট্রিট লাইট না থাকায় রাতের বেলা ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীর আক্রমণের মুখে পড়ার আশঙ্কায় প্রাইভেট কারেও এই রাস্তায় চলাচলের কোনো উপায় নেই। গত মঙ্গলবার কুশিয়ারা ভবনে তুরাগ থানার ওসি নূরুল মোত্তাকিন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫২ নং ওয়ার্ড কমিশনার ফরিদ আহমেদের সঙ্গে এখানকার অধিবাসীদের মতবিনিময় সভা হয়েছে। তারা ১২ নং হতে ১৮ নং সেক্টর অবধি কয়েক কিলোমিটার রাস্তায় রাত ১০টা পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
রুয়াপবাসী একরকম একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করছেন। কেউ কেউ একে উন্নত জেলের সাথেও তুলনা করেন। কিছুদিন আগে দোলনচাঁপা ভবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক ড. তারেক শামসুর রেহমানের বাসার দরজা ভেঙ্গে কাগজপত্র ও চাবি চুরি করে তার ব্যক্তিগত গাড়িটি চুরি করার চেষ্টা চলে। সুরমা ভবনে একজন চিকিত্সকের বাসায় চলে ডাকাতির চেষ্টা। তাছাড়া গত পরশু রূপসা ভবনের একজন ফ্লাট মালিকের সন্তানকে কিডনাপ করা হয়। এজন্য এখানে অতিসত্তর গার্ড নিয়োগ প্রদান ও পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা দরকার।
রুয়াপ এলাকায় স্কুল-কলেজ, স্থায়ী মসজিদ, সুপারশপ, কমিউনিটি সেন্টার, খেলার মাঠ, জিমনেসিয়াম ইত্যাদি এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। খেলার মাঠটি জরুরি ভিত্তিতে মাটি দিয়ে ভরাট করা দরকার যাতে ফ্লাট মালিকদের সন্তান-সন্ততিরা খেলাধুলা করতে পারে। কর্ণফুলি ভবনসহ যেখানে যেখানে লিফটের সমস্যা আছে তার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। সাউথ পয়েন্ট স্কুল কর্তৃপক্ষকে স্কুল নির্মাণে শিগগির বাধ্য করা দরকার। পরিকল্পনা মাফিক প্রতিষ্টা করা দরকার প্রাইমারি স্কুলটিও। স্কুল না থাকায় কয়েক কিলোমিটার দূরে মাইলস্টোন স্কুলে পড়াশুনা করতে গিয়ে আমাদের আদরের একমাত্র কন্যা ফাইজা তাহসিনা সূচি এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। তারপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না। একদিকে সকল নাগরিক সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে অবশিষ্ট কিস্তির জন্য ঠিকই সুদ দাবি করা হচ্ছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ পর্যন্ত সুদমুক্ত কিস্তি সুবিধা নিয়ে বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্লাট মালিকগণ স্বাক্ষরতা অভিযান, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ২০১৬ সালে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে না পারায় তাদের ক্ষতিপূরণের দাবিটিও যৌক্তিক। মোটকথা রুয়াপবাসীর দুঃখ-কষ্ট শোনার জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বসবাসরত ফ্ল্যাটমালিক সমিতি রাজউক চেয়ারম্যানের নিকট যে ১১ দফা দাবি স্থাপন করেছেন তা পূরণে এগিয়ে আসতে হবে আন্তরিকভাবে।
উত্তরা, ঢাকা
