শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের ওয়াশিংটন ডিসির বাসভবনে যখন ফেডারেল এজেন্টরা অভিযান চালাইতে ছিলেন, ঠিক তখন এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম এক্স-এ একটি মন্তব্য লিখিয়াছেন। তিনি কাহারো নাম উল্লেখ না করিয়া কিংবা কোনো কিছুর বিবরণ না দিয়া একটি বাক্যে লিখিয়াছেন- 'নো ওয়ন ইজ অ্যাভব দিল', অর্থাৎ 'কেহ আইনের ঊর্ধ্বে নহে'। খাঁটি কথা। ইহাই হইবার কথা। তবে তিনি যে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সহিত ঝামেলায় জড়াইয়া পড়া বোল্টনের উদ্দেশে বলিয়াছেন, তাহা সকলের নিকটই পরিষ্কার। সন্দেহ নাই, আইন সর্বসমাজে নাগরিক জীবনের অন্যতম রক্ষাকবচ; কিন্তু বাস্তবে, সর্বক্ষেত্রে কি তাহা প্রতিফলিত হয়? বাস্তবতা দেখিয়া দার্শনিক বিয়নের উক্তিকে সামনে আনিয়া যে কেহ দাবি করিতে পারেন, 'আমাকে দেখিয়া নহে, বরং জানিয়া বুঝিয়া তবেই বিচার করুন'; অথবা সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোরের উক্তিটিও স্মরণে আসিতে পারে, 'আইনের মাধ্যমে অত্যাচার করার চাইতে বড় অত্যাচার আর নাই।'
উল্লেখ্য, এই বোল্টন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই ঘনিষ্ঠজন ছিলেন! ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। তাহার বিরুদ্ধে ২০২০ সালে লেখা একটি বইয়ে গোপন তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ আনা হইয়াছে। ট্রাম্প ঐ বইটি প্রকাশে বাধা দিয়া অভিযোগ তোলেন যে, 'চুক্তি লঙ্ঘন করিয়া বইটি প্রকাশ করা হইতেছে।' এই ঘটনার পর ট্রাম্পের সহিত বোল্টন বাহাসে লিপ্ত হন এবং ট্রাম্প প্রশাসন ছাড়ার পর ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি লইয়া কঠিন সমালোচনা শুরু করেন। সম্প্রতি ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়টি লইয়া তীর্যক সমালোচনা করিবার পর পরই বোল্টনের বাড়িতে হানা দেয় এফবিআই।
'কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে' কথাটির ব্যাপক ব্যবহার সর্ব দেশে শোনা যায়। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বে ইহার ব্যবহার যেন মাটির সহিত প্রোথিত হইয়া আছে। ইহা যেন কেবল ক্ষমতাসীনরাই মধুর করিয়া উচ্চারণ করিতে পারেন এবং ইহার প্রয়োগ বা ব্যবহারে তাহারাই অধিক মনোযোগী। এবং তাহা কেবলই একটি বিশেষ পক্ষকে টার্গেট করিয়া! অন্যদিকে, যাহারা ক্ষমতার বাহিরে পড়িয়া যান কিংবা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মতদ্বৈধতার কারণ হইয়া থাকেন, তখন আইন যেন বিশেষভাবে ধারালো হইয়া কেবল তাহাদের উপরেই অধিক করিয়া প্রযোজ্য হইয়া উঠে! মূলত এই কারণেই ডেমোক্রিটাসের ন্যায় দার্শনিকরা বলিয়া গিয়াছেন, 'স্বভাবতই আইন শক্তিমানের সহায়।' ইহা যেন বাস্তবিক অর্থেই ইঁদুর মারার কলের মতো, যাহার শরণাপন্ন হওয়া খুব সহজ এবং যাহা হইতে বাহির হইবার রাস্তাও খুব সহজ নহে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়টি ভালোভাবে ব্যাখা করিয়াছেন; তাহার মতে, 'দলিলে সাক্ষ্যের সহিত উকিলের ব্যাখ্যা জড়িত হইয়া যেই জিনিসটা দাঁড়ায়, সেইটিকে প্রমাণ বলিয়া গণ্য করা চলে না। কেননা অন্য পক্ষের উকিলও সেই একই দলিলের মাধ্যমে বিপরীত কথা বলিয়া থাকেন; ইহার কারণ, বাছাই করা বাক্যের বিশেষ অর্থ নির্ভর করে বিশেষরূপে বাছাই করার উপরেই।' আইনের মারপ্যাঁচ কঠিন বটে!
ম্যাক্সিম গোর্কি বিষয়টি অনুধাবন করিয়া বলিয়াছেন, 'প্রতিটি নতুন সময়ই তাহার আইন জন্ম দেয়।' দ্বিমত থাকিতে পারে না, ক্ষমতার মসনদে আরোহণকালে শাসকগোষ্ঠী যেই সমস্ত 'আইনসম্মত' কথা বলেন, তাহা অনেকের জন্য কখনো কখনো 'নির্মম-নির্দয়' হইয়া দাঁড়ায়। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বে এই প্রবণতা অধিক। সেই সকল সমাজে ক্ষমতাসীনদের মুখে আইনের শাসনের খই ফোটে এবং উহা অতি সুমিষ্ট বটে! আবার তাহারা যখন ক্ষমতার বাহিরে পড়িয়া যায়, তখন এই সকল আইনি কথাবার্তায় তাহাদের জন্য হইয়া উঠে মহা আতঙ্কের কারণ। এই আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি একটি চক্রের মতো। ফলে 'কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে' বাক্যটি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রধান অস্ত্র বলিয়া সাধারণ্যের মধ্যে ধারণা গাড়িয়া বসিয়াছে।
