একটি গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল আইনের শাসন। আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো দেশ সুশৃঙ্খল ও সভ্য হইতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশসমূহে আইনের শাসনের যেমন অভাব রহিয়াছে, তেমনি নাগরিক অধিকার ও কল্যাণের সহিত সম্পর্কিত পর্যাপ্ত আইনের দৈন্যও বিদ্যমান। এই সকল দেশে ঔপনিবেশিক আইনের প্রভাব আজও বহুলাংশে রহিয়া গিয়াছে। এতৎসত্ত্বেও এই সকল দেশে অনেক ভালো ও ইতিবাচক আইনও রহিয়াছে; কিন্তু আইনের প্রয়োগ সেইভাবে নাই বলিলেই চলে। যেমন-বাংলাদেশে 'দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২' নামে একটি চমৎকার আইন রহিয়াছে। ইহা ২০১২ সালের ১ নম্বর আইন; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হইল, এই আইন সম্পর্কে জনসচেনতা খুবই কম। আইনের বাস্তবায়নের অভাবে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর-নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হইয়া যাইতেছে। যত্রতত্র যেমন পোস্টার লাগানো হইতেছে, তেমনি দেওয়াল লিখনও চলিতেছে সমানতালে। যাহারা ব্যক্তিগত দেওয়ালের মালিক তাহারা নিষেধাজ্ঞাসূচক ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি লিখিয়া রাখিলেও তাহার তোয়াক্কা করা হইতেছে না। তাহাদের বাড়িঘরের সৌন্দর্যহানির কারণে তাহারা নানাভাবে বিপাকে পড়িতেছেন। নেতানেত্রীদের পোস্টার যখন ঝড়বৃষ্টিতে নিচে পড়িয়া গড়াগড়ি খায়, তখন তাহাদের মর্যাদাহানি হইলেও সেই ব্যাপারেও কাহারও যেন বোধোদয় হয় না। ইহা ছাড়া বিধিমোতাবেক টানানো তথা অনুমোদিত নির্বাচনি পোস্টারও ১৫ দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ রহিয়াছে। যেইহেতু দেশে এখন নির্বাচনের মৌসুম শুরু হইতে যাইতেছে, তাই এই সময়ে এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা আরো বেশি জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
উক্ত আইনের ৩ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে, নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে না। ধারা ৫ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দেওয়াল লিখন বা ক্ষেত্রমতো পোস্টার মুছিয়া ফেলা বা অপসরণ করা না হইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্ব-উদ্যোগে অননুমোদিত যে কোনো দেওয়াল লিখন বা ক্ষেত্রমতো পোস্টার মুছিয়া ফেলিতে বা অপসরাণ করিতে পারিবেন এবং উক্ত কার্যক্রমের আনুষঙ্গিক ব্যয়ের সমুদয় অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সুবিধাভোগীর নিকট হইতে নগদে আদায় করিতে পারিবেন। ৬ ধারা অনুযায়ী ইহার বিধান লঙ্ঘনের দায়ে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যূন ৫ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে অনধিক ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রহিয়াছে। অথচ সম্প্রতি মেট্রোরেলের পিলারেও সিনেমা, ব্যাবসায়িক ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন পোস্টার লাগাইবার প্রবণতা দেখা দিয়াছে। এই আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মহল হইতে বলা হইয়াছিল যে, আইনে সরকারনির্ধারিত যে স্থানের কথা বলা হইয়াছে তাহার অস্তিত্ব কতটা আছে তাহা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইহার পর সরকার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগাইবার জন্য স্থান নির্ধারণ করিয়া দেয়; কিন্তু তাহার পরও এই আইন লঙ্ঘনের মানসিকতা বন্ধ হয় নাই।
এই ব্যাপারে সর্বশেষ খবর হইল, নির্ধারিত ২৫টি ফ্রি স্ট্যান্ডের বাহিরে শহরের যত্রতত্র ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার লাগাইলে কমার্শিয়াল রেটে চার্জ আদায় করিবার ঘোষণা দিয়াছেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। গত রবিবার রাজধানীর মিরপুরের তালতলায় ফ্রি পোস্টার বোর্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এই কথা জানান। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৫টি জায়গায় ফ্রি পোস্টার স্ট্যান্ড তৈরি করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই নির্ধারিত স্থানের বাহিরে যাহারা পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন লাগাইবেন, তাহাদের আইন অনুযায়ী চার্জ প্রদান করিতে হইবে। এই নিয়ম যথাযথ ও দুর্নীতিমুক্তভাবে কতটা বাস্তবায়িত হইবে তাহা ভবিষ্যৎই বলিয়া দিবে। তবে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখিতে নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুসরণের কোনো বিকল্প নাই। যত্রতত্র ব্যানার-ফেস্টুনের কারণে বিশেষত এই তিলোত্তমা ঢাকা মহানগরীকে আর জঞ্জালে পরিণত করা যাইবে না। কোনো বিবেকবান ও সৌন্দর্য পিপাসু মানুষ এইরূপ অপকর্মের কথা চিন্তাও করিতে পারেন না। এই জন্য যখন যে সরকারই থাকুক, দেশ ও জাতির উন্নতি লাভ করিতে হইলে ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো প্রকার আপস করা সংগত হইবে না।
