সড়ক নির্মাণের ব্যয় প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৩০

বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণের ব্যয় বিভিন্ন দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই জন্য এই ব্যয় কমানোর উপায় খুঁজিয়া বাহির করিতে একটি রিভিউ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিনকে এই কমিটির প্রধান করা হইতেছে বলিয়া জানা যায়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই কমিটি গঠিত হইবার কথা রহিয়াছে। ইহাতে সড়ক পরিবহন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের রাখা হইবে। গত সোমবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান স্বয়ং বলিয়াছেন যে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেট শিডিউল ও সড়কের প্রাক্কলিত ব্যয় রিভিউ করা হইতেছে। তাহার মতে, বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ খরচ ৩০ শতাংশ বেশি।

সড়ক নির্মাণের ব্যয় কমানো হইবে, ইহা খুবই ভালো কথা। এই উপলব্ধি যথার্থ ও সঠিক; কিন্তু দেশের কোনো কোনো এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণের কাজ ফেলিয়া বা অসম্পূর্ণ রাখিয়া ইতিপূর্বে যে বিল তুলিয়া লওয়া হইয়াছে তাহার কী হইবে? কোনো কোনো কাজ শুরু না হইলেও বিল তুলিয়া লওয়ার দৃষ্টান্ত যে নাই তাহাও নহে। এমন পুকুর চুরি বন্ধ করা হইবে কীভাবে? সকলেই এখন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসুক সেই প্রতীক্ষায় রহিয়াছেন। এই চাওয়া-পাওয়া বেঠিক এমন কথা আমরা বলি না; কিন্তু রাজনৈতিক সরকার আসিয়া যদি এই ধরনের লোকদের রাস্তাঘাট নির্মাণের দায়িত্ব দেয় এবং তাহারা পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় লয়, তাহা হইলে কী বিহিত করা হইবে? এমন দায়িত্বহীনতা ও অনিয়মের পথ বন্ধ করিবার জন্য কি আমাদের কোনো অঙ্গীকার রহিয়াছে? তাহা ছাড়া সড়ক নির্মাণ যাহাতে সঠিকভাবে নির্মিত হয়, এই জন্য তাহা দেখভাল করিতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হইতে শুরু করিয়া তাহার অধীনে প্রকল্প পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, এসও, এএসও, ওয়ার্ক অ্যাসিসট্যান্টসহ আরো কতজন কর্মকর্তা যে জড়িত তাহার ইয়ত্তা নাই। এই যে এত বড় চেইন অব কমান্ড, এই সকল দুর্নীতি-অনিয়মের পিছনে তাহাদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নাই? কোনো ঠিকাদার কাজ না করিয়া বিল উঠাইয়া লইয়া গেলে তাহারা কী করেন? তাহা হইলে কি সরিষার মধ্যে ভূত রহিয়াছে? আর সেই ভূত তাড়াইবার উপায় কী?

জানামতে, বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় শতকোটি টাকা বা তাহার চাইতে অধিক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তো বটেই, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণের ব্যয় কয়েক গুণ অধিক। যদি পূর্বেই ঠিকাদার ঠিক রাখা হয় এবং সেই অনুযায়ী ব্যয় ও দরপত্রের শর্ত তৈরি করা হয়, তাহা হইলে এইরূপ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। এই সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের কিছু সড়কের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ অধিক। তাহাদের মতে, উন্নয়নশীল দেশে সড়ক নির্মাণের খরচ বাড়িবার কারণের মধ্যে রহিয়াছে বাজার হইতে সড়কের দূরত্ব, দরপত্রের প্রতিযোগিতা না হওয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, সংঘাত ও উচ্চমাত্রার দুর্নীতি। যেই মাটির উপর সড়ক তৈরি হইতেছে তাহার প্রকৃতির উপর ভিত্তি করিয়াও সড়ক নির্মাণের খরচ কমবেশি হইতে পারে; কিন্তু এত অধিক ব্যয় হইবে কেন?

মূলত আমরা বাংলাদেশে যাহা দেখি তাহাতে ইহাকে হরিলুট ছাড়া আর কী বলা যায়! এই জন্য আমরা কি যথাযথ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারিয়াছি বা পারিতেছি? আমাদের দেশে মানসম্মত রাস্তা নির্মাণ লইয়াও প্রশ্ন রহিয়াছে। সড়ক উদ্বোধন করিবার কিছুদিন পর রাস্তা নষ্ট হইতে দেখা যায়। ইহাতে কি রাষ্ট্রের অর্থের অপব্যবহার ও অপচয় হয় না? অথচ আমাদের দেশে সড়ক গবেষণাগারও রহিয়াছে। তাহা হইলে তাহারা কী গবেষণা করেন-এই প্রশ্নও কি উত্থাপন করা যায় না?

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন