চোরাচালান পণ্য আনার প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমসের অসাধু চক্রের যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণায় অবৈধ পণ্য নিয়ে আসছে চোরাচালান চক্র। দেশের আমদানি ও রপ্তানির প্রধান দ্বার হিসেবে চোরাচালানিদের প্রধান লক্ষ্যস্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এ বন্দর। চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে আমদানি নিষিদ্ধ ও শর্তযুক্ত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কথিত আমদানিকারকগণ অধিকাংশে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারিজের ঘোষণা দিয়ে থাকেন। কাস্টমস আইনে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যসমূহ চেসিস ডেলিভারির মাধ্যমে সরাসরি কারখানার নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে পারবে। তাই কন্টেইনার ভর্তি পণ্য স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে সাধারণত আমদানিকারকের নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে যায়। সেক্ষেত্রে কাস্টমস ও স্ক্যানিংয়ের অসাধু লোকজনের যোগসাজশে অবৈধ এসব পণ্যসমূহ বন্দর থেকে বেরিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃক এ পর্যন্ত আটক উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চোরাচালানির ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ রয়েছে। ২০১৭ সালের ৬ মার্চ কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দা ১২ কন্টেইনার নিষিদ্ধ ও শর্তযুক্ত এবং মিথ্যা ঘোষণার পণ্য আটক করে। এ সময় মদ-বিয়ার, এলইডি টিভিসহ প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার পণ্য আটক করা হয়। কেরানীগঞ্জের জনৈক খোরশেদ আলম পোল্ট্রি কারখানার মেশিনারিজ আমদানির নামে ঐসব পণ্য আমদানি করেন। বছর খানেক পূর্বে বন্দর থেকে পরস্পরের যোগসাজশে বেরিয়ে যাওয়া ২২ কনটেইনারের আমদানির ক্ষেত্রেও শিল্পপণ্য সামগ্রীর ঘোষণা ছিল। গত দুই দিন পূর্বে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃক আটক তিন লাইটারেজ মদ-বিয়ারসহ অন্য খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রেও শিল্পের যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টসের ঘোষণা ছিল। চট্টগ্রাম কাস্টমস সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার বিল অব এন্ট্রি জমা পড়ে। তার সব কয়টি সঠিকভাবে যাচাই করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। আবার যোগসাজশ থাকলে সেক্ষেত্রে অবৈধ বা মিথ্যা ঘোষণার পণ্য আটক করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
২০১৭ সালের মার্চ মাসে আটক ১২ কনটেইনারের তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, একই আমদানিকারকের নামে পূর্ববর্তী বছরের এপ্রিল থেকে এক বছরে আরো ৭৮ কনটেইনার পণ্য খালাস নেওয়া হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে পোল্ট্রি ফিড কারখানার মেশিনারিজ ঘোষণায় পণ্যগুলো অন চেসিস ডেলিভারির আওতায় বন্দর থেকে বেরিয়ে যায়। সে সময় শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেছিলেন, এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি মাফিয়া চক্র জড়িত। কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে পণ্য খালাস পর্যন্ত সকল স্তরকে ম্যানেজ করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে এ অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃক মিথ্যা ঘোষণার পণ্য সন্দেহে ২২টি কনটেইনার আটক করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কনটেইনারগুলো সবার অজ্ঞাতে খালাস হয়ে যায়। সাধারণত কাস্টমসের এআইআর বিভাগের একটি পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পণ্য খালাস বন্ধ করতে লক করা হয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে এর পাসওয়ার্ড থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া লক খুলে পণ্য খালাস নেওয়া সম্ভব নয়। এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত শেষে আমদানিকারক, সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান এবং কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়ী করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিকট রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানির ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও অন্যান্য যন্ত্রণাংশের আড়ালে মদ-বিয়ারসহ অন্য পণ্য আমদানি করা হয়। বড়ো বড়ো কার্টনসমূহ মাদার ভেসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে নামানোর সময় একটি কার্টনের অংশ বিশেষ ভেঙে একটি মদের বোতল বেরিয়ে আসলে পুরো ঘটনা ধরা পড়ে। অনেকের মতে, কার্টন না ভাঙলে আদৌ অবৈধ চালানটি ধরা পড়ত কিনা সন্দেহ রয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের শুল্ক গোয়েন্দার প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুল হাকিম জানান, প্রভাবশালী চোরাচালান চক্র এ সকল আমদানি নিষিদ্ধ ও শর্তযুক্ত মিথ্যা ঘোষণার পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িত; যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।
