বিশ্বের ইতিহাসে বহুবার দেখা গিয়াছে, একটি দেশের 'বিপ্লব' বা গণঅভ্যুত্থানের পর শুরু হয় অতিমাত্রার আবেগ, জনতার ক্ষোভ ও পূর্ববর্তী শাসকের প্রতি তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ; কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই পরবর্তী সময়ে দেখা গিয়াছে, ঐ কথিত সামাজিক বিপ্লব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য একপ্রকার গণঅভ্যুত্থান মাত্র। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর নাগরিক সমাজ যাহা প্রত্যাশা করে-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, বিচার ও স্বাধীনতা, সুনীতি ও সুশাসন-এই বিষয়গুলি যেন অধরাই থাকিয়া যায়। আফ্রিকার বহু দেশ এই দুঃসহ বাস্তবতার সাক্ষী। লিবিয়া হইতে সুদান, সোমালিয়া হইতে সিয়েরা লিওন-প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, উচ্ছ্বসিত গণআন্দোলনের পরে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হইলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা তাহারা দৃঢ়ভাবে ধারণ করিতে পারে নাই। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার কেবল কাগজে কলমে থাকিল; বাস্তবে দেশটি দ্রুত গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়। বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী রাজধানী ও তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল দখল করে; জনগণের মধ্যে ব্যাপক শৃঙ্খলাহীনতা দেখা যায়। ভাঙিয়া পড়ে আইনশৃঙ্খলা। একইভাবে, সোমালিয়ায় সিয়াদ বারীর স্বৈরতন্ত্র পতনের পর গণতন্ত্রের পরিবর্তে আসিল গোষ্ঠীগত যুদ্ধ, দস্যুবৃত্তি ও সম্পূর্ণ রাষ্ট্রভঙ্গুরতা দেখা দেয়। আফ্রিকার সাহেলী অঞ্চলের দেশ মালি ও নাইজারেও কথিত গণঅভ্যুত্থানের পর ক্রমে সামরিক শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই ঘটনাপ্রবাহ ব্যাখ্যা করিতে চাহিয়াছেন বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। স্যামুয়েল হান্টিংটন, যিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং 'পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটি' গ্রন্থে উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্লেষণ করিয়া দেখাইয়াছেন, সেইখানে তিনি স্পষ্ট করিয়াছেন-যদি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্বল হয়, তাহা হইলে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায় অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে। আফ্রিকার নানান স্থানে ইহার বাস্তব প্রতিফলন আমরা প্রত্যক্ষ করি। তদ্রূপ, আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট জ্যাকসন ও কার্ল রোজবার্গ তাহাদের গ্রন্থ 'পারসোন্যাল রুল ইন ব্ল্যাক আফ্রিকা' গ্রন্থে দেখাইয়াছেন, উপনিবেশোত্তর আফ্রিকায় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা অধিকাংশ সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর উপর দাঁড়াইয়া থাকে। ফলে শাসক পতনের পর রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত অচল হইয়া পড়ে, ভাঙিয়া পড়ে আইনশৃঙ্খলা, যাহার ফলে সামরিক শক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে নৈরাজ্যে লাগাম টানিয়া ধরিতে। এই সকল দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে-যেই সমাজে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সুসংহত নহে, যেই রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বলিষ্ঠ নহে, সেখানে বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি অধিকাংশ সময় নৈরাজ্যেই পর্যবসিত হয়।
ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনার বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে। প্রথমে উদ্দাম জনতা পুরাতন শাসন উৎখাত করে, পরে দুর্বল বেসামরিক সরকার অরাজকতার মুখে ব্যর্থ হয় এবং সর্বশেষে সেনাশাসন একপ্রকার 'অবশ্যম্ভাবী পরিণতি' রূপে উপস্থিত হয়। নাইজেরিয়া তাহার জীবন্ত দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার মাত্র ছয় বৎসর পর ১৯৬৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিল; তারপর কয়েক দশক ধরে সামরিক সরকারই দেশ শাসন করিয়াছে। অবশ্য, কেবল আফ্রিকাই নহে, লাতিন আমেরিকার বহু দেশও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু-সকলখানেই দেখা গিয়াছে, জনগণের উচ্ছ্বাসমুখর বিদ্রোহের পর বেসামরিক গণতন্ত্র টিকিতে পারে নাই; সামলাইতে পারে নাই আইনশৃঙ্খলা। ফলস্বরূপ সামরিক বাহিনী শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ লইয়াছে। লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসন ও দুর্বল গণতন্ত্র বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিলারমো ও' ডোনেল বলিয়াছেন- 'যখন রাষ্ট্রকাঠামো ভঙ্গুর থাকে, তখন সেনাশাসন কেবল দমনমূলক শক্তি নহে, তাহা সমাজের নৈরাজ্য রোধের একমাত্র অবলম্বন বলিয়া উপস্থিত হয়।'
ইহাতে প্রতীয়মান হয়- কোনো দেশ যদি প্রকৃত গণতন্ত্র চায়, তাহা হইলে শুধু শাসক পরিবর্তন করিলেই চলিবে না, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমকে শক্তপোক্ত করিতে হইবে। তাহা না হইলে গণঅভ্যুত্থান কেবল পুরাতন শাসন সরাইয়া নতুন বিশৃঙ্খলাই উপহার দেয়। বিশ্বের ভঙ্গুর রাষ্ট্রসমূহ ইহার দৃষ্টান্তস্বরূপ দাঁড়াইয়া আছে।
