টক অব দ্য কান্ট্রি হলো ছেলেধরা গুজব। গুজব আমাদের জাতীয় জীবনের এক অংশ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো না কোনো গুজব সবসময় লেগে আছে। এসব গুজব কারা ছড়ায়, কেন ছড়ায়, তা বড়ই অভেদ্য বিষয়। তবে আমি এমন একজনকে জানি যে ইচ্ছে করে গুজব ছড়াই। এটাই তার আয়ের পথ। তার নাম গুজব মনা!
পাড়ার ডুকার মুখেই প্রকাণ্ড এক তেঁতুল গাছ। এ গাছের তেঁতুল খুব মিষ্টি। তাই এপাড়া ওপাড়ার সব ছেলে-বুড়ো ভিড় করে গাছতলায়। তেঁতুল নিয়ে মারামারিও হয় হরহামেশা। মনাদা হলো পাড়ার সবচেয়ে দুষ্ট ছেলে। রাজ্যের যত দুষ্ট বুদ্ধি তার মাথা থেকেই বেরোয়। একবার রাত দশটার দিকে দেখা গেল তেঁতুল গাছে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সবাই ভীত! এমনিতেই তেঁতুল গাছ ভূতের আস্তানা, তার ওপর এমন লাল আগুন! সবাই কানাঘুষা করছে, হয়তো ভূতদের রাজা এবার আসন গেড়েছে এই গাছে। কেউ ভয়ে আর গাছের নিচে যায় না। অনেকদিন পর মনাদা আমায় হাসতে হাসতে জানাল সেই রাতের কাহিনি। আগুন লাগিয়েছিল মনাদাই। গাছের তেঁতুল সব পেড়ে বাজারে ভালোই দাম পেয়েছিল সেবার!
একবার দেখি সারাপাড়ায় লাল এক টাকার কয়েন নিয়ে হুলস্থূল অবস্থা। এই টাকা নিয়ে সরকার নাকি বিভিন্ন দামি কাজে লাগাবে। তাই সরকার এসব কয়েন মার্কেট থেকে উঠিয়ে নিচ্ছে। চারদিকে লাল কয়েন বেচাকেনার উত্সব চলছে। আমিও আমার কাছে থাকা পাঁচটি কয়েন পঞ্চাশ টাকা দরে বিক্রি করে দিলাম! বুঝতে বাকি রইল না এই গুজব মনাদারই সৃষ্টি! গেলাম পাড়ার চায়ের দোকানে। সেখানে দেখি মনাদা আয়েশ করে চা খাচ্ছেন। ব্যাপারখানা কী জিজ্ঞেস করতেই মনাদা বিখ্যাত মুচকি হাসি হেসে বললেন, ‘আর বলিস না, পকেটে কোনো টাকা-পয়সা নাই। বাড়িতে কিছু লাল পয়সা ছিল, তা দিয়েই রটিয়ে দিলাম। এক সপ্তাহের খরচ উঠে গেল!’
একবার তো ভাইরাসে মোবাইল ফেটে মানুষ মারা যাওয়ার গুজব রটিয়ে অনেক মোবাইলের মালিক হয়ে যান মনাদা। এক কথায় গুজব রটাতে ‘বস’ মনদা।
দুই.
ওপাড়ার সাইমাকে বেশ ভালো লেগেছে। কোনোভাবেই মনের কথা বলতে পারছি না। মনের কথা মনেও রাখতে পারছি না। সেদিন বৃহস্পতিবার, স্কুল হাফ ছুটি। তাই দুপুরবেলা একটা চকলেট বক্স নিয়ে ওই পাড়ার বাঁশ বাগানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। এ রাস্তাটা মোটামুটি নির্জন। একটু সময় নিয়ে মনের কথা বলা যাবে। কিছুক্ষণ পর দেখি সাইমা ও তার কয়েকজন বান্ধবী হেঁটে আসছে। কাছে আসতেই আমি সাইমার পথ আগলে দাঁড়াই। অন্য মেয়েরা আমার পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তারা ভয় পেয়েছে বুঝতে পারলাম। সাইমাও দেখি ভয় পেয়েছে। কাঁদো কাঁদো অবস্থা। কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। যেই মনের কথা বলতে যাব, অমনি পিছন দিক থেকে কে যেন চিত্কার করছে, ‘সাইমাকে ছেলেধরা নিয়ে যাচ্ছে!’ আর কী মনের কথা বলা যায়! কোথায় গেল সাইমা, কোথায় গেল চকলেট। সব ফেলে দিলাম প্রাণ বাঁচানোর দৌড়। পিছন ফিরে দেখি সবার হাতে লাঠিসোটা। কিভাবে যে সেই যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলাম তা আল্লাহই ভালো জানেন! একটু হলেই প্রাণ হারাতে বসেছিলাম।
কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করে, রাগ সপ্তমীতে তুলে গেলাম মনাদার ঘরে। বাড়ি গিয়ে শুনি মনাদা হাসপাতালে। অবস্থা খারাপ! হাসপাতালে গিয়ে দেখি বেডে গড়াগড়ি খাচ্ছে মনাদা। আমাকে দেখে মুচকি হাসলেন। ‘কী ব্যাপার?’ ‘আরে বলিস না, গেলাম সদরে বাজার করতে। রাস্তার পাশে দেখি একটা বাচ্চা কাঁদছে। হয়তো কারো বাচ্চা হারিয়েছে। একটু এগিয়ে গিয়ে, আদর করে কোলে তুলে নিলাম। এতে কান্না আরো বেড়ে গেল! এরপর লোকজন জড়ো হয়ে যা হলো তা বুঝে নে...। একটা মাইরও মাটিতে পড়েনি। সব পিঠের ওপর। পুলিশ না এলে আর বেঁচে আসতে হতো না। মরতে মরতে বেঁচে গেলাম!’
‘এবার বুঝো, নিজের গর্তে নিজেই পড়লে। এমন গুজব কি কেউ ছড়ায়! লাভটা কী হলো?’
‘আরে এ গুজব আমি ছড়াইনি!’
‘তবে এটা কার কাজ?’
‘প্রতি পাড়ায় পাড়ায় এমন মনা পড়ে আছে। এটা তাদেরই কাজ! ও ব্যথা! আমি শেষ! এমন গুজব আমি ছড়াই না। এটা গুজব নারে গজব! আর কোনো গুজব ছড়াব না কখনোই!’ ঠিকানাবিহীন।
