পার্বত্য জেলা ‘রাঙামাটি’ যেমন রূপে-গুণে বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর নামের বানান নিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা। এই জেলার নামের বানান নিয়ে নানা মুনীর নানা মত। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি গণমাধ্যম পর্যন্ত - সবখানেই ‘রাঙামাটি’, ‘রাঙ্গামাটি’, ‘রাংগামাটি’ - এই তিনটি বানান নিয়ে চলে তর্কযুদ্ধ। কোথাও ‘ঙ’, কোথাও ‘ঙ্গ’, কোথাও আবার ‘ং’ - কোনটি সঠিক, তা নিয়ে আজও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার অংশ। ১৮৬০ সালে চট্টগ্রামকে ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করা হয়, যার সদর দপ্তর ছিল রাঙামাটি। এরপর ১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি জেলায় ভাগ করা হয় - খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এবং রাঙামাটি। সেই থেকে রাঙামাটি একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে পরিচিতি পায়।
তবে এই পরিচিতির সঙ্গে শুরু হয় বানান বিভ্রান্তির ইতিহাস। তৎকালীন রাঙামাটির সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দাপ্তরিক ভাষায় জেলার নাম ‘রাঙ্গামাটি’ অথবা ‘রাংগামাটি’ এই বানানে লেখা হতো। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙামাটি জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার কার্যালয়সহ অন্যান্য দপ্তরে ‘রাঙ্গামাটি’ বানানটি ব্যবহৃত হতো নিয়মিতভাবে।
জেলার সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ - রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙামাটি সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং রাঙামাটি সরকারি কলেজেও দাপ্তরিক ভাষায় জেলার নামের বানান ‘রাঙ্গামাটি’ এভাবেই লেখা হচ্ছে। এই বানানটি যেন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচিতির অংশ হয়ে গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম পত্রিকা ‘দৈনিক গিরিদর্পণ’ তাদের সংবাদ প্রকাশে ‘রাঙ্গামাটি’ বানানটি ব্যবহার করে থাকে। তবে জেলার আরেকটি পুরাতন পত্রিকা ‘দৈনিক রাঙামাটি’ সেই ৮০ দশক থেকেই ‘রাঙামাটি’ বানানটি ব্যবহার করে আসছে। এই পত্রিকাটি বানান নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছে শুরু থেকেই।
রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের ক্ষেত্রেও দেখা যায় এই পরিবর্তন। প্রতিষ্ঠার শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির দাপ্তরিক ভাষায় ‘রাঙ্গামাটি’ বানানটি ব্যবহৃত হলেও, গত কয়েক বছর ধরে ‘রাঙামাটি’ বানানটি ব্যবহার করছে এটি।
পূর্বে সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ‘রাংগামাটি’ বানানটি ব্যবহার করলেও বর্তমানে এই বানানটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যদিও কিছু পুরনো সাইনবোর্ড বা দলিলপত্রে এখনো ‘রাংগামাটি’ বানানটি দেখা যায়, তবে গত কয়েক দশক ধরে গণমাধ্যমে ‘রাঙামাটি’ বানানটি বেশি প্রচলিত হয়েছে।
এই বিভ্রান্তির কেন্দ্রে রয়েছে ভাষাগত বিশ্লেষণ। এ ব্যাপারে রাঙামাটি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘রাঙ্গামাটি বানান নিয়ে অনেক সময় অনেকেই ভিন্নভাবে লেখেন। তবে “রাঙ্গামাটি” বানানটা “রাঙ্গা” এভাবেই সঠিক হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান রীতি অনুযায়ী রাঙামাটি শব্দের সঠিক বানান হলো “রাঙামাটি” । অর্থাৎ “রাঙা” (রঙিন, লাল) এবং “মাটি” (মাটি) শব্দ দুটি মিলেই রাঙামাটি। বাংলা একাডেমীতে ‘রাঙামাটি’ বানানটিকেই সঠিক বলে গ্রহণ করা হয়েছে।’
এই দ্বিধা সত্ত্বেও, রাঙামাটি জেলা ও এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘রাঙ্গামাটি’ বানানটি বহুলভাবে ব্যবহৃত। সুতরাং, বাংলা একাডেমীর প্রমিত নিয়ম অনুসারে “রাঙামাটি” বানানটি শুদ্ধ হলেও, প্রচলিত বা স্থানীয়ভাবে ‘রাঙ্গামাটি’ বানানটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে দীর্ঘ বছর ধরে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ‘দৈনিক রাঙামাটি’ পত্রিকার সম্পাদক ও রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার আল হক বলেন, ‘রাঙামাটি বানানের ক্ষেত্রে “রাঙামাটি” এ বানানটি সঠিক। কারণ “রাঙা” অর্থ হলো লাল এবং “মাটি” মানে মাটি। অর্থাৎ এ অঞ্চলের মাটি লাল হওয়ায় রাঙামাটি বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সেই ৮০ দশকের শুরু থেকে আমাদের পত্রিকার নাম “দৈনিক রাঙামাটি” দিয়েছি। তথা রাঙামাটি লিখার ক্ষেত্রে আমরা “রাঙ্গা” বানানটির পরিবর্তে ‘রাঙা’ এ বানানটি লিখে থাকি। “রাঙ্গামাটি” এ বানান আমরা ব্যবহার করি না সেই সময় থেকে।’

