পুলিশের যানবাহন সংকট কাটিবে কি?

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৬:৫১

গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবরে পুলিশের উপর এক বীভৎস হামলার ঘটনা ঘটে। দুষ্কৃতকারীদের হাতে আটককৃত এক যুবককে উদ্ধার করিতে গিয়া ব্যাপক হামলা-আক্রমণের মুখে পড়েন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়, পুলিশ সদস্যদের পিটাইয়া আহত করার পাশাপাশি ছুরিকাঘাতে হত্যার শিকার হন এক কনস্টেবল। এই ধরনের একটি বা দুইটি ঘটনা নহে, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের উপর দুষ্কৃতকারীদের হামলা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়িতেছে। 

বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করিয়া বৃদ্ধি পাইতেছে পুলিশ-জনতা বিরোধ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া এইভাবে 'আইন হাতে তুলিয়া লওয়ার প্রবণতা' চলমান বাস্তবতায় বাড়িবে বই কমিবে না, যাহা অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান! আদাবরের ঐ ঘটনার পর একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমের নিকট নিজেদের 'ভীতির কথা' বলিয়া হা-হুতাশ করিয়াছিলেন। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যে ক্রমবর্ধমান হারে আতঙ্ক ছড়াইয়া পড়িতেছে এবং তাহারা রাস্তায় নামিতে ‘ভয়' পাইতেছেন, বিভিন্ন সময় তাহাদের বক্তব্য-বিবৃতিতেও বিষয়টি পরিষ্কার বুঝা যায়।

ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে পুলিশ বাহিনীর নিরাপত্তা-ঘাটতির এক দুঃখজনক চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে। প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, অপরাধ দমনে জীবন বাজি রাখিয়া যেই পুলিশ বাহিনী অহর্নিশ দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতেছে, সেই বাহিনীর হাতে নাই প্রয়োজনীয় যানবাহন বা গাড়ি। ফলে তাহারা নিরুপায় হইয়া লেগুনা-বেবিট্যাক্সি প্রভৃতি ভাড়া করিয়া টহল কার্যক্রম পরিচালনা করিতে বাধ্য হইতেছেন। গত বছর গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশব্যাপী পুলিশের দুই সহস্রাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাহার খুব নগণ্যই পরবর্তী সময়ে মেরামত করা হইয়াছে। অর্থাৎ, মেরামতের অনুপযোগী গাড়ির স্তূপ এই বাহিনীর দীর্ঘদিনের যানবাহন বা গাড়ির সংকটকে আরো প্রকট করিয়া ভুলিয়াছে। উপরন্তু, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হইতে সম্প্রতি উত্থাপিত দুই শতাধিক গাড়ি ক্রয়ের প্রস্তাবটিও আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতা ও মারপ্যাচে আটকাইয়া গিয়াছে। বাংলাদেশের ন্যায় একটি জনবহুল দেশে-যেই দেশটি কি না গণঅভূত্থান- পরবর্তী ক্রান্তিকাল পার করিতেছে, সেইখানে সুবিশাল পুলিশ বাহিনীর এহেন আকাল ও অচলাবস্থা গভীর উদ্বেগজনক।

পুলিশের দাবি, এই বাহিনী বর্তমানে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত । যানবাহনের অভাবে যথাযথ নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হইতেছে, ব্যাহত হইতেছে থানা পুলিশের টহলসহ নিয়মিত কার্যক্রম। এমনকি অপরাধের খবর পাইলেও তাহারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাইতে পর্যন্ত পারিতেছেন না শুধু লক্কড়ঝক্কড় গাড়ির কারণে। ইহার ফলে অন্যান্য ইউনিটের কাজও ব্যাহত হইতেছে। অধিকন্তু, এহেন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রায় সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন সংকট লইয়া আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি লইতে হইতেছে বাহিনীকে। ইহাতে রেসপন্স টাইম বেশি লাগিবার পাশাপাশি স্বভাবতই মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার সমূহ শঙ্কা থাকিয়া যায়।

স্মর্তব্য, পৃথিবীময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় নিরাপত্তার বিষয়টিতে। দেশের নিরাপত্তার সহিত উন্নয়নসহ সকল কিছুই নির্ভরশীল। অথচ পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে সেই 'নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে যাহারা রহিয়াছেন, তাহাদেরই নিরাপত্তা নাই! বিদ্যমান যানবাহনের মাধ্যমে থানা-পুলিশের রুটিন ডিউটি পালন কঠিনতর হইয়া পড়িতেছে। বিশেষ করিয়া, মোটরসাইকেল ও ডাবল কেবিন পিকআপ সংকটের কারণে তাহারা প্যাট্রল ডিউটি পরিচালনায় বেগ পোহাইতেছেন। মফস্সল বা রিমোট এলাকায় অপরাধ দমন হইয়া উঠিয়াছে আরো জটিল ও কঠিন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে তাহারা মানুষকে নিরাপত্তা দিবেন কীভাবে? সমগ্র দেশে যখন অপরাধপ্রবণতা ক্রমশ বাড়িতেছে, তখন দায়িত্ব পালনে পুলিশকে তাকাইয়া থাকিতে হইতেছে ভাড়া করা লেগুনা-বেবিট্যাক্সির দিকে। এই সকল সস্তা ব্যবস্থা দিয়া কখনোই জননিরাপত্তা নিশ্চিত হইতে পারে না। তাহা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সচরাচর যেই মানের গাড়ি সরবরাহ করা হইয়া থাকে, বিদ্যমান পরিবেশে তাহার কার্যকারিতা লইয়া প্রশ্নের অবকাশ রহিয়াছে। অন্যান্য দেশে যেইখানে পুলিশ বাহিনীর উত্তরোত্তর আধুনিকায়ন ঘটিতেছে, সেইখানে আমরা তাহাদের হাতে কোয়ালিটি সম্পন্ন ও যুগোপযোগী নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি তুলিয়া দিতে পারিতেছি না, যাহা নিতান্ত দুঃখজনক।

প্রতিটি সমাজের মানুষ ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে অবাধ চলাচলের পাশাপাশি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা কামনা করে। নিরাপত্তা রক্ষার এই মহান দায়িত্বটি পালন করিয়া থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই কারণে আইনশঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির ঘাটতি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত । সুতরাং, শুধু পুলিশ বাহিনী নহে, দেশের প্রতিটি নিরাপত্তা বাহিনীর যানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন