পাকুয়াখালী গণহত্যা প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৫:৫৭

মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া কী ব্যথা বুকে ধারণ করে বেঁচে আছেন সেটা হয়তো তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্মম এক ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আজও বেঁচে আছেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ০৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ৩৫ জন নিরস্ত্র বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করে। ঐ দলে মোট ৩৬ জন কাঠুরিয়া ছিলেন। একমাত্র বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া, যিনি কৌশলে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার বেঁচে ফেরার মাধ্যমে এই নির্মম হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়েছিল। তিনি বেঁচে না ফিরলে হয়তো এতো বড় একটি হত্যাকান্ড রহস্যবৃত্তই রয়ে যেত।

যে সময়টিতে এই হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হয় সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি পরিবর্তনের হাওয়া বইছিল। ১৯৭৭ সাল হতে শান্তিবাহিনী সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮১-১৯৯০ সালের এরশাদ সরকারের শাসনামলে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কার্যক্রম বন্ধের জন্য আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরশাদ সরকারের আমলে এ সংক্রান্ত মোট ৬টি বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে শান্তি আলোচনার সূত্রপাত হয়। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে শান্তি প্রক্রিয়া আরও তরান্বিত হয় এবং এ সংক্রান্ত মোট ১৩টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আওয়ামীলীগ  সরকার গঠনের পর তারা শান্তি আলোচনার চূড়ান্তরূপ প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তখন অনেকটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বৈচিত্র দেখে অনেকেই হয়তো ধারণা করতে পারবেন না ৮০ ও ৯০ এর দশকে সেখানকার জীবনযাত্রা কেমন ছিল। সেই সময়ে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি সম্পূর্ণরুপে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের উপর নির্ভরশীল ছিল। জুম চাষ, কাঠ সংগ্রহ এবং মৎস্য আহরণই ছিল পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রধানতম পেশা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা মূলতঃ বন থেকে কাঠ কেটে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। গরীব বাঙালিরা কাঠুরিয়া হিসেবে বন থেকে কাঠ কাটার কাজে নিয়োজিত ছিল। অপরপক্ষে, একটু অবস্থাসম্পন্ন বাঙালিরা কাঠুরিয়াদের মাধ্যমে কাঠ সংগ্রহ করে বিপণনের কাজ করতো। তবে, সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেই শান্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। বন থেকে কাঠ সংগ্রহের জন্য কাঠ ব্যবসায়ী ও কাঠুরিয়াদের শান্তিবাহিনীকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো। চাঁদার বিষয়ে আলোচনার জন্য শান্তিবাহিনীর সদস্যরা প্রায়শইঃ কাঠ কাটতে যাওয়া কাঠুরিয়াদের সঙ্গে গভীর জঙ্গলে বৈঠক করতো। কাঠ ব্যবসায়ীরা ব্যবসার মূল অংশীদার হলেও কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শান্তিবাহিনীর সামনা-সামনি আলাপ-আলোচনা বা বৈঠক হতোনা। শান্তিবাহিনীর নিয়োজিত কালেক্টররা কাঠ ব্যবসায়ী ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের দায়িত্ব পালন করতো। এর মূল কারণ ছিল শান্তিবাহিনীর সদস্যরা লোকালয়ে আসতোনা আর কাঠ ব্যবসায়ীরা গহীন জঙ্গলে গিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিলনা। সাধারণভাবে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা কাঠ পরিবহনের সময় ব্যবসায়ীদের নিকট হতে পথে চাঁদা আদায় করতো। আর কাঠুরিয়ারা জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনার সময় ঘনফুট হিসাবে দৈনিক ভিত্তিতে শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিতেন।

০৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ তারিখে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা চাঁদা আদায় সংক্রান্ত আলোচনার জন্য একটি বৈঠক আহবান করে। চিরাচরিত প্রথা ভেঙে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা কাঠুরিয়াদের পাশাপাশি কাঠ ব্যবসায়ীদেরকেও ঐ বৈঠকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। মাইনীমুখ বাজারের কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে সম্ভবত বৈঠকের আমন্ত্রণটি অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। তাই তারা বৈঠকে অংশগ্রহণের বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে, দরিদ্র কাঠুরিয়াদের সেসব নিয়ে ভাববার অবকাশ ছিলনা। কারণ ব্যবসায়ীদের না হয় সঞ্চিত অর্থ-সম্পদ আছে কিন্তু কাঠুরিয়াদেরতো দৈনিক কাঠ কাটার রোজগার দিয়েই সংসার চালাতে হয়। আগে-পিছে না ভেবে, কাঠ ব্যবসায়ীদের মতো গভীর চিন্তা না করে তারা সরল মনে কাঠ কাটতে পাকুয়াখালীর জঙ্গলের পথ ধরেন। সেদিন মোট ৩৬ জন কাঠুরিয়া পাকুয়াখালীতে কাঠ কাটতে গিয়েছিলেন। পথিমধ্যে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা কাঠুরিয়াদের পথরোধ করে। তারা কাঠুরিয়াদেরকে জানায় যে, কাঠ কাটা শুরু করার পূর্বে তাদের নেতা কাঠুরিয়াদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকের পর তারা কাঠ কাটতে যেতে পারবেন। এরকম বৈঠকের ঘটনা পূর্বে অনেকবার ঘটেছে। তাই সরল মনেই কাঠুরিয়ারা বৈঠকে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে পথ চলতে শুরু করেন। কিছুদূর চলার পর জঙ্গলের ভিতর লুকিয়ে থাকা কয়েকজন শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সদস্য কাঠুরিয়াদেরকে ঘিরে ফেলে। কাঠুরিয়াদের সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে তাদের হাত বেঁধে ফেলা হয়। কাঠুরিয়াদেরকে বলা হয় যে, বৈঠকের জায়গায় নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাদের হাত বাঁধা থাকবে এবং বৈঠকস্থলে পৌছার পর হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হবে। কাঠুরিয়াদেরকে ৪/৫ জন করে কয়েকটি উপদলে ভাগ করে ফেলা হয়। একটি করে উপদলকে আলাদা করে কয়েকজন সশস্ত্র শাস্তিবাহিনীর সদস্য জঙ্গলের ভিতর নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কেউই আর ফিরে আসছিল না। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে কাঠুরিয়া ইউনুস মিয়া বিপদ আঁচ করতে পারেন। তার মনে সন্দেহ হয় যে ভিতরে যাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটছে এবং একটু পর তার সঙ্গেও এমন কিছুই ঘটতে যাচ্ছে। তিনি সঙ্গোপনে তার হাতের বাঁধনটি আলগা করার চেষ্টা করেন এবং সেখান থেকে পালানোর রাস্তা খুঁজতে থাকেন। 

তিনি শান্তি বাহিনীর সদস্যদেরকে বলেন যে, তার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়া প্রয়োজন। তাকে হাতের বাঁধন খুলে একটু পাশে নিয়ে প্রসাব করার সুযোগ করে দেয়া হয়। সেখান থেকেই ইউনুস পালানোর পরিকল্পনা করেন। তবে, বসা থেকে দাঁড়ানোর সময় তার মাথা একটি গাছের ডালে বাড়ি লেগে শব্দ হলে দুইজন শান্তিবাহিনীর সদস্য তার দিকে অস্ত্র তাক করে ফেলে। ইউনুসের পালানোর প্রথম পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়। তাকে আবার হাত বেঁধে অন্যান্য কাঠুরিয়াদের সঙ্গে বসানো হয়। হাত বাঁধার সময় ইউনুস মিয়া তার হাত দু'টো কৌশলে এমনভাবে রাখেন যাতে বাঁধনটা খুব শক্ত না হয়। হাত বেঁধে বসানোর পর সুযোগ বুঝে তিনি আস্তে আস্তে তার হাতের বাঁধন আলগা করে ফেলেন। কাউকে বুঝতে না দিয়ে সেভাবেই কিছুক্ষণ বসে থাকেন। তারপর সুযোগ বুঝে জঙ্গলের ভিতর দৌড়ে পালান। এ সময় একজন শান্তিবাহিনীর সদস্য অস্ত্র তাক করে তাকে পালাতে নিষেধ করে। তিনি তা অগ্রাহ্য করে পার্শ্ববর্তী একটি ছড়ার পানিতে ঝাপ দেন। শান্তিবাহিনীর সদস্যরা গুলি চালালেও তা সৌভাগ্যক্রমে ইউনুস মিয়ার গায়ে লাগেনি। ছড়ার পাশের একটি গাছের কোটরে লুকিয়ে তিনি লতাপাতা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখেন। সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে আসলে তিনি লুকানোর স্থান হতে বের হন। তার জানা ছিল যে, ছড়ার পথ ধরলেই তিনি তার নিজের এলাকায় ফিরে যেতে পারবেন। ছড়ার মধ্য দিয়ে চুপিসারে সারারাত হেঁটে ভোর বেলায় তিনি তার বাড়ীতে পৌছান। তখনকার সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল ছিল। তাই একদিন পর অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর নিকটবর্তী সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা ইউনুস মিয়ার বাড়িতে পৌছে সমস্ত ঘটনা শোনেন এবং তাকে নিয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ঘটনাস্থলে পৌছে তারা যে দৃশ্য অবলোকন করেন তা নৃশংসতার এক চরম দৃষ্টান্ত। শান্তি বাহিনীর হাতে অপহৃত হওয়া ৩৫ জনের মধ্যে ২৮ জনের লাশ তারা আশেপাশের জঙ্গলে খুঁজে পান। তবে, সেই লাশগুলো ছিল বিকৃত। এই ২৮টি লাশের কোনটাতেই কোন গুলির চিহ্ন ছিলনা। কারও চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, কারও শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছে, কাউকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছে, আর কয়েকজনকে দা দিয়ে কোপানোর কারণে শরীর থেকে অঙ্গ আলাদা হয়ে গেছে। 

শান্তিবাহিনী তাদের নৃশংসতা ও পাশবিকতার চিহ্ন রেখে যায় প্রতিটি লাশের সঙ্গে। অথচ এই কাঠুরিয়াদের সঙ্গে শান্তি বাহিনীর কোনই শত্রুতা ছিলনা। এরা ছিল গরীব ও নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষ। অপহৃতদের মধ্যে ৭ জনের লাশও আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় আরও গভীর জঙ্গলে নিয়ে শান্তি বাহিনী তাদেরকে হত্যা করেছিল। ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজও জনসম্মুখে আসেনি। বেঁচে যাওয়া মোহাম্মদ ইউনুস মিয়াও একটি মামলা দায়ের করেন। কাঠুরিয়াদের সঙ্গে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে ইউনুস মিয়া হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া অধিকাংশ সন্ত্রাসীকেই চিনতেন। তিনি নিজে সেই হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তা সত্ত্বেও গত ২৯ বছরে এই নির্মম হত্যাকান্ডের কোন বিচার হয়নি। বেঁচে ফেরা ইউনুস মিয়াও বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। যে ৩৫ জন কাঠুরিয়া এই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন তাদের পরিবার কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার চাচ্ছেন। কারণ দেশের আইন আদালত এতো জঘন্য একটি হত্যাকান্ডের কোন বিচার করতে পারেনি। তারপরও মাঝে মাঝে একজন ইউনুস মিয়া আশায় বুক বাঁধেন যেকোনো একদিন কোন এক সরকার এই জঘন্যতম হত্যাকান্ডের বিচার করবে। ইউনুস মিয়ার আশা পূরণ হবে কি?

লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক

ইত্তেফাক/এএইচপি