বিগত সরকারের আমলে মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস ভর্তি প্রক্রিয়ায় অটোমেশন (স্বয়ংক্রিয়) পদ্ধতি চালু করার পর থেকে শুরু হয়েছে বিশৃঙ্খলা। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে এই পদ্ধতিতে ভর্তির ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব না পড়লেও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ এই অটোমেশন পদ্ধতির কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ফলে সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষেও ৪৬৭টি আসন খালি রয়ে গেছে। এতে অভিভাবক ও ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। অটোমেশন চালুর কারণে দেশীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি ছাত্রছাত্রীরাও বাংলাদেশে মেডিক্যাল শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অথচ অটোমেশন চালুর আগে ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী এ দেশে ডাক্তারি পড়তে আসতেন।
অভিভাবক ও উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা জানান, আগে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা যাতায়াত ও পরিবারের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা অনুযায়ী তাদের পছন্দের কিংবা কাছাকাছি অবস্থিত মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতেন। কিন্তু অটোমেশন চালু করার এই সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যাতায়াত ও পরিবারের সুবিধার্থে বাড়ির কাছাকাছি যে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ আছে সেখানে তাদের বেশির ভাগ ভর্তি হতে ইচ্ছুক। কারণ যশোরের একজন শিক্ষার্থী ঢাকা, বরিশাল বা চট্টগ্রামে ভর্তি হতে গেলে তাকে আর্থিকসহ নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। তাদের মতে, অটোমেশন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ। তাই অটোমেশন পদ্ধতি বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়। একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক দাবি করেন, এর পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তার ষড়যন্ত্র। প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ধ্বংস করার একটি গভীর যড়যন্ত্র চলছে। এদেশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালাল কিংবা এজেন্ট রয়েছে। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে যখন বিদেশি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছিল, শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের নামে সেই সময় অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়। যাতে বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা এখানে ভর্তি হতে না পারে। ষড়যন্ত্রকারীরা সেই কাজ করে সফল হয়েছে। পছন্দের কলেজ না পাওয়ায় বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের এদেশে ভর্তির হার অর্ধেক হয়ে গেছে। দেশ হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ লাখ ৩১ হাজার ৭২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ হাজার ৯৫ জন উত্তীর্ণ হয়। এদের মধ্যে ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ৫ হাজার ৩৮০ আসনে ভর্তি সম্পন্ন হলেও ৬৭টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ৬২৯৫ আসনের মধ্যে ৪৬৭টি খালি রয়েছে। এর আগের শিক্ষাবর্ষেও অনেক সিট খালি ছিল।
প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, দেশের স্বাস্থ্য শিক্ষায় বেসরকারি খাতের অবদান অপরিসীম। সরকার এই খাতের প্রতি নজর না দিয়ে নতুন নতুন নীতিমালা করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অটোমেশন পদ্ধতি ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব নয়। বেসরকারি মেডিক্যাল শিক্ষা খাত রক্ষা করতে হলে অটোমেশন পদ্ধতি বাতিল করা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অটোমেশন চালু করায় বিনা খরচে অর্থাত্ দরিদ্র কোটায়ও ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে চাচ্ছেন না। এ বছর দরিদ্র কোটায় ৩৬টি আসন খালি রয়েছে। কারণ হিসেবে দরিদ্র পরিবারের পক্ষ হতে জানিয়েছে যে, তাদের পছন্দের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে না পারলে সেখানে তারা ভর্তি হতে চায় না। অটোমেশন পদ্ধতি চিকিত্সা শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে বাতিল করা জরুরি।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বলেন, অটোমেশনের নামে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে বড় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও চিকিত্সকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এটা মেধাবী শিক্ষার্থীরা পছন্দ করছেন না। দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন তারা। চিকিত্সা শিক্ষা ও রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে পূর্বের পদ্ধতি ফিরে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
এ নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সুমন নাজমুল বলেন, প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজগুলোর অটোমেশনসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে বিএমডিসিসহ জড়িত অন্যান্য বিভাগ কার্যক্রম শুরু করছে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
