'ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি' 

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:৪২

গতকাল ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। এটি জাতিসংঘ-ঘোষিত দিবস। ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সব দেশে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনের ৭নম্বর রেজল্যুশনে ১৫ সেপ্টেম্বরকে গণতন্ত্র দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কেন ১৫ সেপ্টেম্বরকে বেছে নেওয়া হলো? ১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট কোরাজন একুইনো প্রথম বারের মতো স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রসমূহ নিয়ে একটা সম্মেলনের আয়োজন করেন। নাম দেওয়া হয় 'ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন নিউ অ্যান্ড রেস্টোর্ড ডেমোক্রেসি (আইসিএনআরডি)। সেই সম্মেলনে নতুন গণতন্ত্র পাওয়া দেশগুলোর গণতন্ত্র সংহতকরণের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিইউ) 'ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি' শিরোনামে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর ১০ বছর পর ২০০৭ সালে জাতিসংঘ ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পরের বছর থেকে পালিত হচ্ছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সে চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর অনেকে দেশে গণতন্ত্র নামেমাত্র কার্যকর রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর মতো অনেক দেশে সরাসরি সামরিক শাসন না থাকলেও, অনেক দেশে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো সামরিক একনায়কদের মতোই আচরণ করছে বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মত। ফ্রিডম হাউজের ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের পশ্চাদ্যাত্রা অব্যাহত আছে, এই নেতিবাচক ধারা গত বছর সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ২০২০ সালে ৭৩টি দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবনতি হয়েছে, উন্নতি ঘটেছে মাত্র ২৮টিতে। যেসব দেশে অবনতি ঘটেছে, সেগুলো পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মানুষের আবাসভূমি। অবনতিশীল গণতন্ত্রের দেশগুলোর ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অগণতান্ত্রিক বলে মনে করেন না, বরং নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষাকারী বলেই দাবি করেন।

গণতন্ত্র কি একটি আদর্শ শাসনব্যবস্থা? প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রের যুগ থেকে শুরু করে মানবজাতি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য ও সর্বাধিক ন্যায়সম্মত শাসনব্যবস্থার অন্বেষণে যে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে, সেখানে গণতন্ত্রের স্থান ও গুরুত্ব কোথায়? বিশ্ব জুড়ে এমন প্রশ্ন জনগণের মনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয়, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের মুখোশধারীদের আক্রমণই এখন বৈশ্বিক সমস্যা। একদিকে তারা নিজেদের দাবি করেন গণতন্ত্রী বলে, অন্যদিকে তারাই আবার গণতন্ত্রের মূলনীতি এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা এবং সরকার বিষয়ে প্রায় ৪০০ বছরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের আলোচনায় দেখা গেছে যে, গণতন্ত্রের চারটি মূল আদর্শ হচ্ছে জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্ব, দায়বদ্ধতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

এই তো কিছুদিন আগে পর্যন্ত রাশিয়া ও চীনের মতো শাসনগুলোকে ধনতন্ত্রের উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। সেখানে প্রভাবশালী অলিগার্ক বা ধনকুবেররা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তার করতেন। রাশিয়ার পুতিন সরকারে ইউরি কোভালচুক, গেন্নাদি তিমশেঙ্কো ও রোতেনবার্গ ভাইদের স্পষ্ট প্রভাব ছিল। অন্যদিকে চীনে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ঝং শানশান ও মা হুয়াতেংয়ের মতো শতকোটিপতিদের বেড়ে ওঠায় সহায়তা করেছে। কিন্তু আজ উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও ক্রমে এই ধনিকতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। ট্রাম্পের 'বিলিয়নিয়ার বয়েজ ক্লাব'-এ ইলন মাস্ক, হাওয়ার্ড লুটনিক, বিবেক রামস্বামীসহ আরো অনেকেই রয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির সরকারের এই সময়ে ভারতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মোদি প্রশাসন মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি ও সাজ্জন জিন্দালের মতো কিছু ধনকুবেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য হলো ব্যবসাবান্ধব নীতি চালু করা এবং অর্থনীতিকে আরো উদারীকরণ করা। শুধু ভারত নয়, এমন ধনকুবেরদের প্রভাব ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, তুরস্কসহ অন্য অনেক উদার গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যাচ্ছে। এখন ধনকুবেররা শুধু অর্থনীতির নয়, রাজনীতিতেও এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি অর্থনীতির একটি বড় পরিবর্তনের অংশ। আগে নব্য উদারবাদ, অর্থাৎ মুক্তবাজারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হতো। এখন আমরা নব্য সামন্ততন্ত্রের দিকে যাচ্ছি। নব্য সামন্ততন্ত্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে চরম বৈষম্যের কারণে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ কেবল ধনীদেরই সেবা করে বেঁচে থাকে।

গণতন্ত্রের জন্য আমরা প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছি। গণতন্ত্রের দেখা কি মিলছে? গণতন্ত্র কি কেবল নির্দিষ্ট সময় পর পর ভোটাধিকার? নাকি জনগণের যেমন খুশি তেমন বিচার-আচার? পরিতাপের বিষয়, এক মানবই আরেক মানবের অধিকার কেড়ে নেয় ক্ষমতা পেলে। রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র কখনো দ্রুত কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। বিশেষ করে, সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ ও তার সংস্কৃতিতে যে গতিতে গণতন্ত্রায়ণ ঘটে, তার গতি অনেকটা সমাজ বিবর্তনের গতির সমান। যেসব রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক সরকার থাকা সত্ত্বেও তার কাছ থেকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক আচরণ পাওয়া যায় না, তার সঠিক পর্যালোচনার জন্য সব সময়ই দরকার হয় ঐ রাষ্ট্রের ইতিহাসের গতিবিধি।

বলা বাহুল্য, একটি টেকসই ও সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখন বাংলাদেশের আপামর জনগণের দৃঢ় চাওয়া। তবে তা একাই জনগণের

ভাগ্যাকাশে উদিত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন নতুন উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, যা গণতান্ত্রিক চেতনা, মূল্যবোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করবে।

ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে ক্ষমতায় বসালেই কেবল হয় না, গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত পাহারা দিতে হয়। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যারা ক্ষমতায় গেলেন, তারা স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন, স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারেন, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারেন, এমনকি তারা নিজেদের

অদক্ষতার স্বাক্ষরও রাখতে পারেন

সন্দেহ নেই, শত বিরূপতার মধ্যেও এখন পর্যন্ত ভালো বিকল্পের নাম গণতন্ত্র। আব্রাহাম লিংকন তার বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে: 'জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার, জনগণের কল্যাণের জন্য সরকার।'

গণতন্ত্রই বিশ্বের সামনে সুশাসনের লক্ষ্যে আশার আশ্রয়। তত্ত্বগতভাবে গণতন্ত্র, নির্বাচন, সুশাসন ও উন্নয়ন-এসব প্রত্যয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তার জন্য এসবের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কারণ, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গতিশীল গণতান্ত্রিক ধারার আলোকে বিকশিত হয়। আবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আবশ্যিকভাবে একটি অপরিহার্য বিষয়। আবার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পারে প্রকৃত সুশাসন, যা স্বচ্ছ, জবাবদিহি, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনস্বার্থ সংরক্ষণ করে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত জনমুখী ও টেকসই উন্নয়নের গ্যারান্টি দেয়।

গণতন্ত্র, নির্বাচন, সুশাসন ও উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপী আজ রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজ, উভয়েই সচেতন। নাগরিক সমাজ তথা জনগণই একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক ধারা, সফল নির্বাচন, লাগসই উন্নয়ন ও কার্যকর অর্থে প্রকৃত সুশাসন নিশ্চিত করার পেছনে মূল চালিকা শক্তি। এবং এই শক্তির বলেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারক ও প্রশাসকসহ সকলেই সাংবিধানিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এমনই পটভূমিতে বিধিবদ্ধ সাংবিধানিক দিক-নির্দেশনার আলোকে সামনে বাংলাদেশের একটি জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ অপেক্ষমাণ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে নানা কারণে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কেমন হবে, তার ওপর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারা, সুশাসনের বিকাশ ও উন্নয়নের বিস্তারসহ আরো অনেক কিছুরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, নির্বাচনকে বলা হয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব। গণতন্ত্রে শত ফুল প্রস্ফুটিত করতে সবার অংশগ্রহণ ও ভূমিকা যাতে সুনিশ্চিত হয় এবং তা নানামুখী চাপ বা বিঘ্নের সম্মুখীন না হয়ে অব্যাহত থাকতে পারে, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের সাফল্যের প্রয়োজনে এই সারসত্য মোটেও বিস্মৃত হওয়ার অবকাশ নেই। এটাই এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা যে জনগণের সামগ্রিক কল্যাণে শেষ ভরসা গণতন্ত্র।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ওয়াইল্ডলাইফ বিশেষজ্ঞ

ইত্তেফাক/এমএএম