২৪ ঘণ্টায় আরো ৬৮৩ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ০০:১১

ডেঙ্গুর ব্যাপকতা বাড়ছেই। বছর শেষ হতে এখনো পাঁচ মাস বাকি থাকলেও চলতি মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এ বছর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৫২৮ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৮৩ জন নতুন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ অন্তত তিন নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। 

এদিকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। কারণ এভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে হাসপাতালগুলোতে সেবা দেওয়া আর সম্ভব হবে না। রক্ত পরীক্ষার জন্য এখনই হাসপাতালগুলোতে এক সঙ্গে ৩০০ থেকে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের দীর্ঘ লাইন থাকছে। তিন থেকে চার ঘণ্টার আগে পরীক্ষা শেষ করাতে পারছেন না রোগীরা। চিকিত্সকরা বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় একমাত্র পথ হলো অ্যাডিস মশা ধ্বংস করা। জনগণ এখন অনেক সচেতন; কিন্তু দুই সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সেইভাবে সচেতন নয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী উখেং নু রাখাইন মারা গেছেন। গত ১৭ জুলাই তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে গেলে তাকে কক্সবাজার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল বিকালে সেখান থেকে চট্টগ্রাম নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। গত কয়েকদিনে কমপক্ষে ২৫ শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিত্সা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আমাদের জাবি সংবাদদাতা আবির আব্দুল্লাহ।

রুমানা খান (২৫) নামের এক গৃহবধূ গতকাল ভোরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তিনি ঢাকাস্থ বেনাপোল সমিতির উপদেষ্টা জামসেদ আলী খানের স্ত্রী। ১০ জুলাই তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এছাড়া তেজগাঁও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মসজিদের ইমাম মাওলানা মাহাবুবুর রহমানের স্ত্রী নাইমা আক্তার (৩৮) সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকিত্সকরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বর যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অ্যাডিস মশা মারার কার্যকর সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হয়নি। মশা মারার কার্যকর ওষুধ আনা হচ্ছে না। অথচ অ্যাডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪৮ জন  ডেঙ্গু আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছিল। মৃতের সংখ্যা ছিল ২৬। তবে ২০০০ সালে ৯৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ডই ছিল সর্বাধিক। চলতি বছরের সাত মাস শেষ হওয়ার আগেই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন রোগীর সংখ্যা  দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫২৮। ফলে ২০১৮ সালের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড স্থাপিত হলো। এ সময়কালে বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৩০। গত বছরের জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৫ হাজার ৫০ জন। এ বছর জানুয়ারিতে ৩৭, ফেব্রুয়ারিতে ১৯, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মে মাসে ১৮৪, জুনে ১ হাজার ৮২৯ ও জুলাইয়ের গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৩৮৪ জন রোগী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, চলতি মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ইতিমধ্যে আক্রান্ত ১০ হাজার ৫২৮ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭ হাজার ৮৪৯ জন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ২ হাজার ৬৭১ জন।

জানা গেছে, ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়তে থাকায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত শয্যার বাইরেও মেঝেতে রেখে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে রোগীদের। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী ভর্তি করছে না। ফলে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্তদের নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়াতে হচ্ছে স্বজনদের। ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে অন্য রোগে আক্রান্তদের চিকিত্সা দিতেও সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সি বলেন, ‘ডেঙ্গুর রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিন ৩০০/৪০০ রোগী তাঁর কাছে পরীক্ষার জন্য আসছেন।’ আতঙ্কিত না হয়ে অ্যাডিস মশা মারার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে কিছু নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তা আমরা পরীক্ষা করে দেখছি। অচিরেই এর কারণ নির্ণয় করতে সক্ষম হব।’

ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতালের উপপরিচালক মোজাহার হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালের ফ্লোরে সিট দিয়ে ডেঙ্গু রোগীর চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। আরো কয়েক শ রোগী ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু জায়গা নেই।’

ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ

ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ কেবল ঢাকায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বাইরেও। প্রতিদিনই চিকিত্সা নিতে বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন রোগীরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেল্থ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৬৮৩ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এরমধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৩৩, মিটফোর্ডে ৭, শিশু হাসপাতালে ৯, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৩৬, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ২২, বারডেম হাসপাতালে ১২, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ২৪, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৯,  বিজিবি সদর হাসপাতালে ১৩ ও কুর্মিটোলায় ৩২ জন ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ২০৫, ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় হাসপাতালে ৪০ রোগী চিকিত্সাধীন। এরমধ্যে গাজীপুরের তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজে ৬১ জন, মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে তিন জন, কিশোরগঞ্জে এক জন, নারায়ণগঞ্জে ১৩ জন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৫ জন, চট্টগ্রামে ২৪ জন, ফেনীতে ৪৯ জন, কুমিল্লায় এক জন, চাঁদপুরে ২৯ জন, ব্রা?ক্ষ্মবাড়িয়ায় চার জন, নোয়াখালীতে পাঁচ জন, কুষ্টিয়ায় ১৯ জন, খুলনায় ২৪ জন, যশোরে ২০ জন, ঝিনাইদহে তিন জন, বগুড়ায় ৪০ জন, বরিশালের শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৬ জন, বরিশাল জেলায় ৯ জন ও সিলেটে ১৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিএসএমএমইউতে ৪০ বেডের ডেঙ্গু সেল চালু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ৪০ শয্যাবিশিষ্ট ডেঙ্গু চিকিত্সাসেবা সেল চালু করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিন ব্লকের নিচতলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের চিকিত্সাসেবায় এ সেল চালু করা হয়। ডেঙ্গু চিকিত্সাসেবা সেল উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান। এ সময় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, মেডিসিন অনুষদের ডিন ও মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জিলন মিঞা সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ৪০ শয্যার মধ্যে ২৫টি শয্যা কেবিন ব্লকে এবং অন্য শয্যাগুলো ডি ব্লকের মেডিসিন বিভাগে। ডেঙ্গু চিকিত্সাসেবা সেলে গতকাল সাত জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

ঢাবিতে শতাধিক শিক্ষার্থী ডেঙ্গু আক্রান্ত

আমাদের ঢাবি সংবাদদাতা আব্দুল হাকিম আবির জানান, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও। প্রশাসনের গাফিলতি এবং পর্যাপ্ত মশক নিধন কার্যক্রম চালু না রাখার ফলে এমনটা হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তবে প্রশাসনের দাবি, তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানকার শতাধিক শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর আগে গত শুক্রবার রাতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবির স্বাধীনের। ফিন্যান্স বিভাগের ২০তম ব্যাচের এ ছাত্রের গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায়। কয়েকদিন আগে একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী কর্মচারী। 

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা যাতে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে সেজন্য আমাদের মেডিক্যাল সেন্টারে একটা নতুন মেশিন কেনা হয়েছে। আজ রবিবার এই মেশিন বসবে। ডেঙ্গুর চিকিত্সা নিতে যাতে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের বিড়ম্বনা না হয়, সেজন্য মেডিক্যাল সেন্টারকে সব ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।