নাগরিকত্ব ছাড়া রাখাইনে ফিরতে নারাজ রোহিঙ্গারা

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৯, ২২:১১

নাগরিকত্ব ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। গতকাল শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিব মিন্ট থু’য়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের শিবিরে আলোচনার জন্য গেলে রোহিঙ্গা নেতারা এ কথা জানান।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে করণীয় নির্ধারণে গতকাল উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের ১৯ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলটি। রোহিঙ্গারা কোনো দৃশ্যমান ভিত্তি ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে রাজি না হওয়ায় গতকাল দুই দফা বৈঠক হয়। বৈঠকে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে যৌথ সংলাপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল ও রোহিঙ্গারা। এই সংলাপে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। তবে কবে নাগাদ এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ তথ্য নিশ্চিত করে কক্সবাজার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্মকর্তা (আরআরআরসি) মো. আবুল কালাম বলেন, প্রত্যাবাসন একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই হঠাত্ এটি সমাধান হবে এমন আশা করা দুরূহ। আজকের (শনিবার) বৈঠকে যৌথ ডায়ালগের কথা উঠে এসেছে। রবিবারও বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হবে।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিব মিন্ট থু’য়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বিমানযোগে গতকাল সকাল ১০টায় কক্সবাজারে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান কক্সবাজার ত্রাণ প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দোজা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম সরওয়ার কামালসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এরপর প্রতিনিধিদলটি বিমানবন্দর থেকে হোটেল রয়েল টিউলিপে যায়। সেখান থেকে দুপুর দেড়টার দিকে যায় উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। সেখানে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ছাড়াও রোহিঙ্গাদের ৩৫ জনের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। এদের মধ্যে সাত জন নারী ও ২৮ জন পুরুষ রোহিঙ্গা ছিলেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, ঘণ্টা তিনেকের বৈঠকটি দুই দফায় চলে। আলোচনায় মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে আহ্বান জানান। ফিরে গেলে সেখানে রোহিঙ্গাদের কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তারা ধারণা দেন। পররাষ্ট্রসচিব মিন্ট থু বলেন, ‘আমরা আপনাদের ফিরিয়ে নিতে এসেছি। রাখাইনে আপনাদের জন্য ঘরবাড়ি, স্কুলসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনারা  (রোহিঙ্গা) মিয়ানমারে ফিরে যান।’ তবে তার কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি রোহিঙ্গা নেতারা। 

মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনকালে উখিয়ার কুতুপালংয়ের ক্যাম্পে বিক্ষোভ করে রোহিঙ্গারা। তারা তখন বলতে থাকে, ‘আমরা বাঙালি নই, আমরা রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে আমাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় আমরা ফিরে যাব না। আমাদের মা-বোনদের যে নির্যাতন করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদেরও বিচার করতে হবে।’ রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে না পারায় মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি জানিয়েছে, আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

বিকাল ৫টার দিকে বৈঠক শেষ হলেও মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। কয়েকজন রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম জানান, বৈঠকে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে যৌথ ডায়ালগে সম্মতি দিয়েছেন মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা। প্রতিনিধিদলটি আজ রবিবার রোহিঙ্গা হিন্দু ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়ে আছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা শুরু হয়নি।

সূত্রমতে, আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে চায় মিয়ানমার। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে তারা। গত বছরও মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। এরপরও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। 

এদিকে মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটির সঙ্গে আসিয়ানের (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের আঞ্চলিক জোট) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক মানবিক সহায়তা কেন্দ্র বা আহা সেন্টারের একটি প্রতিনিধিদলও রয়েছে।