বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন শুধু একটি খেলা নহে, বরং তাহা হইয়া উঠিয়াছে আরো বৃহত্তর আবেগ ও উত্তেজনার বিষয়। গত বৃহস্পতিবার যখন এশিয়া কাপে আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কার ম্যাচ চলিতেছিল, তখন কে জিতিবে, কে হারিবে-তাহা লইয়া ঢাকার চায়ের দোকান হইতে শুরু করিয়া চট্টগ্রামের সৈকতপাড় পর্যন্ত উত্তেজনা চলিয়াছে। অথচ ম্যাচের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল-আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কা-কোনোটিই বাংলাদেশ নহে। যদিও সেই খেলার অনেক যদি এবং কিন্তুর উপর বাংলাদেশ দলের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল। এই কারণে দর্শকের হৃদয়ে ঐ ম্যাচটিতে যেন বাংলাদেশই খেলিতেছে মাঠে।
ইহা বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্মাদনারই প্রতিচ্ছবি। কোনো পরীক্ষার অঙ্ক মিলাইতে না পারার ভয় যেইভাবে ঘুম কাড়িয়া লয় ছাত্রের চোখ হইতে, তেমনিভাবে বাংলাদেশের সমর্থকদের ম্যাচের সময়টিতে জটিল অঙ্কের হিসাব মিলাইতে হইয়াছে। কখনো রানরেট, কখনো উইকেটের পতন-যাহার মধ্যে লুকাইয়া রহিয়াছে সুপার ফোরের সমীকরণ। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগে যাহারা শৈশবে অতিষ্ঠ হইয়াছিল, তাহারা যেন এখনো পালাইতে পারে নাই সেই সকল হিসাব হইতে। আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নবি যখন শেষ ওভারে একে একে পাঁচটি ছক্কা হাঁকিলেন, তখন ঢাকায় কোনো ছাত্র নিশ্চয়ই বইখাতা সরাইয়া রাফখাতায় এই অঙ্কই করিতেছিল-'এই রান হইলে নেট রানরেট কত দাঁড়াইবে?' আর শ্রীলঙ্কা হঠাৎ ব্যাটিং ধসাইলে বাংলাদেশের অসংখ্য গৃহিণী নিশ্চয়ই রান্নাঘরের চুলা নিভাইয়া ছুটিয়া গিয়াছেন টেলিভিশনের সম্মুখে, যেন ইহা তাহাদের নিজ পরিবারের ভাগ্যনির্ধারণী যুদ্ধ।
বাংলাদেশের ক্রিকেট দর্শকের আবেগ কেবল যুক্তির সমীকরণে ধরা যায় না। তাহারা এক অদ্ভুত বিশ্বাসের আশ্রয় লইয়া চলেন-'আমি যদি এখন টিভির সম্মুখ হইতে উঠিয়া যাই, তাহা হইলে দল হারিবে।' আবুধাবির প্রেসবক্সেও শুনা গিয়াছে, বাংলাদেশ তথা ঢাকা-চট্টগ্রামের কোটি কোটি দর্শক টিভির সম্মুখে গভীর উত্তেজনার সহিত এই ম্যাচ দেখিতেছে। যেন আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ম্যাচ নহে, বাংলাদেশ দল খেলিতেছে। যদিও ক্রিকেট এক মহান অনিশ্চতার খেলা। হংকংয়ের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশকে জিতিতে গিয়াছে ঘাম ঝরাইয়া। আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরাজয়ের পর আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে জিতিলেও তাহা মাত্র আট রানের ব্যবধানে-শেষ ওভারে বোলারের হাতে ছক্কা খাইয়া রক্তচাপ বাড়াইবার ব্যবস্থা করিয়াছিল। অথচ একটু বড় ব্যবধানে জয়লাভ করিলে এই 'যদি-কিন্তু'র সমীকরণে কোটি দর্শকের মাথা ঠুকিতে হইত না।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে তাকাইলেই দেখা যায়, বহুবারই অন্য দলের জয়-পরাজয়ের উপর নির্ভর করিয়া আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হইয়াছে। যেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়িতেছি-স্বরাষ্ট্রনীতির চাইতে বৈদেশিক নীতিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মাঠে ভালো খেলার পরিবর্তে চাহিয়া থাকিতে হয়, অন্যের মাঠে কী ঘটিতেছে। তবে ক্রিকেটের এই উন্মাদনার ভিতর দিয়াই এক অদ্ভুত জাতীয় ঐক্য জন্ম লয়। গ্রামের হাটের দোকানদার হইতে শহরের অধ্যাপক পর্যন্ত, সবার আলোচনার বিষয় এক-'আজকের ম্যাচে কী হইবে?' দেশ বিভক্ত হইয়া যায় রাজনৈতিক মতভেদে, কিন্তু ক্রিকেটে জয় আসিলেই গোটা জাতি এককণ্ঠে উল্লাস করে। হাস্যরসও কম নাই; টিভির সামনে বসিয়া কেউ যদি মন্তব্য করেন- 'খেলাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চা খাব না'-তাহা শুনিয়া পাশের জন হাসিয়া গড়াইয়া পড়েন। আবার কেউ বলেন- 'খায় জামাল্যা মোটা হয় কামাল্যা, কিন্তু রানরেটের সমীকরণে শেষে আমরা হই যাই কাহিল্যা।'
এই উন্মাদনার মূলতত্ত্ব হইল-বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটকে কেবল খেলা মনে করে না, তাহা হইয়া উঠিয়াছে এক প্রকার সম্মিলিত আবেগ, যেন জাতীয় পরিচয়ের অংশবিশেষ। এই কারণে আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কার ম্যাচেও বাংলাদেশ দারুণভাবে উপস্থিত থাকে দর্শকের হৃদয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই- খেলাটির মধ্যে কোটি মানুষের মনে আনন্দ, ক্ষোভ, হাসি ও কান্নার রং মিশিয়া যায়। এই আবেগই আমাদের শক্তি, আবার কখনো দুর্বলতাও।
