পূজা: আইনশৃঙ্খলায় দায়িত্বরতদের প্রাকনির্বাচনি পরীক্ষা

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০০:৫৮

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার এবারের আয়োজনও বেশ বড়। আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ২৮ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী এবং ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী এই দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে। দম ফেলার ফুরসত নেই মৃৎশিল্পীদের। কাজের ভীষণ চাপ। প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। খরচও বেড়েছে। এবার প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত ৫০ কেজির মাটির বস্তার দাম ২ হাজার থেকে ২.৫ হাজার টাকা। আছে পরিবহন খরচ। আগে যে খড়ের গাদা ৪০০ টাকায় মিলত, এবার গুনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ১৫০ টাকার সুতলির বান্ডিল ২০০-২২০ টাকা, ২০০ টাকার বাঁশ এখন ৫০০ টাকা।

এই বাড়ার বিষয়ে সরকারও আগাম সচেতন। সরকারি অনুদান বাড়ানো হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, এর পরও দুর্গাপূজা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজনের প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে সব করা হবে। গেল বছর দেওয়া হয়েছিল ৪ কোটি টাকা।

সামনে নির্বাচন। সংগত কারণেই দুর্গাপূজা একটু স্পর্শকাতর। অঘটন ঘটানোর পটীয়সীদের কাছে একটি মৌসুম। যদিও এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো তথ্য বা হুমকি নেই। তার পরও পূজা নির্বিঘ্নে উদ্যাপনে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। পূজার সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য একটি অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হয়েছে। এই অ্যাপের সহায়তায় যে কোনো ঘটনা ঘটলে তার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকারের কাছে পৌঁছে যাবে। নানা দিক ভেবে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পূজা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করছে সরকার। এবার নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে পূজা হওয়ায় রাখতে হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। দুর্গাপূজা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও এতে কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বী নয়, অন্যান্য ধর্মের লোকজনও অংশ নেয়। নির্বাচনেও অংশ নেবে সব ধর্মের লোকেরা। মন্দ মহলের কাছে তাই এটি ভেজাল বাধানোর মোক্ষম সময়। গত বছর দুর্গাপূজায় ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কড়া পাহারা বসিয়ে পূজা হবে, এমন দেশ আমরা চাই না। পাহারা বা নজরদারি ছাড়া নির্বিঘ্নে রোজা-পূজাসহ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করতে পারার অভিপ্রায় থেকেই এমন উচ্চাশার কথাটি বলেছিলেন তিনি।

বাস্তবতা হচ্ছে সেই নির্বিঘ্ন থাকার সময় এখনো আমাদের কাছে ধরা দেয়নি। মহল বিশেষ থাকেই এমন মৌসুমে হাঙ্গামার চেষ্টায়। যে কারণে প্রধান উপদেষ্টাকে আহ্বান জানাতে হয়েছে দুর্গাপূজা ঘিরে, যাতে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের সুযোগ তৈরি না হয়, সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকার। বলেছেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। ধর্ম, মত বা অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে কাউকে কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যাবে না। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ নিয়ে এবারও বলেছেন, 'আমরা চাই না নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাটোপে থেকে ধর্ম পালন করতে। চাই নাগরিক হিসেবে মুক্তভাবে যার যার ধর্ম পালন করতে। এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের ধর্মীয় উৎসব পালনে অতিরিক্ত নিরাপত্তার ঘেরাটোপের প্রয়োজন হবে না।'

বাস্তবতা এখনো সেখানে না যাওয়ায় পূজায় অতিরিক্ত নিরাপত্তার ঘেরাটোপ। ফেক নিউজ, স্যোশাল মিডিয়ায় মিথ্যার ছড়াছড়িতে কমতি নেই। দুর্গাপূজাকে ঘিরে বানোয়াট সংবাদ ছড়ানোর প্রবণতা অবশ্যই একটি সতর্ক বার্তা। আমাদের দেশে ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এগুলোর যে কোনোটিতে সামান্য গোলমাল ঘটলেই সেটিকে বিশাল করে ছড়ানো হবে, সেটা পরিষ্কার দেশের প্রধান দল বিএনপি থেকেও দলের নেতাকর্মীদের একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে ষড়যন্ত্রকারীদের যে কোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রতিরোধের প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঐতিহ্যগতভাবে সবার সহযোগিতায় শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনের মাধ্যমে এ দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনুপম দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক অতীতে পলাতক বিগত স্বৈরশাসনের সুবিধাভোগীরা দুর্গোৎসবের সময় হীন ও অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে একাধিকবার ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকারান্তরে সতর্কতা, তা সবাইকে সাবধান রাখে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ ও কর্মঠ রাখে। এটি এক ধরনের ভরসা ও অঘটনের বিষয়ে সতর্কতা হিসেবে কাজে দেয়। প্রস্তুতি কখনো ফেলনা যায় না। এছাড়া আমাদের বিশেষ ভরসার জায়গায় রয়েছে সেনাবাহিনী। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর সাম্প্রদায়িক ভেজাল বাধানোর চেষ্টা রুখে দিয়েছে তারা। নানান ছবি, কাহিনি দিয়ে রটানো সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের কাহিনি সেই সুবাদে বাজারে খাওয়ানো যায়নি। সেনাবাহিনী মাঠ থেকে সরেনি। যেনতেনভাবে উদ্যাপনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব তারা পালন করেছে। এ কাজগুলো সচরাচর পুলিশের। কিন্তু, পুলিশবাহিনীর দুর্গতির কারণে সেনাবাহিনীকে চালাতে হয়েছে এসব কর্মধারা। তা বিনা বাধায় বা নিমেষে হয়নি। কাজগুলো করতে গিয়ে সেনাসদস্যদের যন্ত্রণার শিকার হতে হয়েছে। গণআন্দোলনের পূর্বাপর সময়ে কেবল সাম্প্রদায়িক গন্ডগোল পাকানো নয়, দেশের পার্বত্যাঞ্চলে নাশকতা তৈরির চেষ্টাও চলেছে। তা এখনো অনেকের অজানা।

নয়, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়েই মাঠে আছে। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রস্তুতিও আছে। তাদের মাঠে থাকা মহলবিশেষের জন্য খুব কষ্টের-অপছন্দের। জননিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত অরাজকতা প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের কারসাজি রুখে দেওয়া, মিলকারখানা সচল রাখা, রাষ্ট্রের কেপিআই এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনাগুলোকে রক্ষা, সড়ক-মহাসড়ক বাধামুক্ত রাখা, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, বিদেশি কূটনীতিক ব্যক্তি ও দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজে সেনাবাহিনীর তৎপরতা অসহ্য তাদের কাছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ বিশ্বসভার সদস্যদের প্রতিক্রিয়ায়ও। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জনগণের ওপর দমন-পীড়নকে রোধ করতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা একটি ইতিবাচক ঘটনা।

এবারের পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কী রকমের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি হয়েছে, কত সড়ক-মহাসড়কে অবরোধ হয়েছে, কত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, সরকারি সংস্থা অথবা অফিস-সংক্রান্ত জটিলতা হয়েছে, অনেকেরই এ সংক্রান্ত ধারণা নেই। দ্রুতগতিতে কোনো প্রচার বা হাঁকডাক ছাড়াই সেনাসদস্যরা সেগুলো ফয়সালা করেছে। টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে অপ্রীতিকর ঘটনার সমাধানও করেছে। বড়দিন, পূজা, মাহফিল, ওরস, রাসমেলা, নবান্ন উৎসবসহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে এ সময়টাতে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের হাত থেকে স্থানীয় নিরীহ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সেনাবাহিনীর কেবল বিশেষ যৌথ অভিযান নয়, জীবনবাজি রেখে কাজ করতে হয়েছে। এখনো করছে। গেল বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব পদবির অফিসাররা যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে কোনো হাঁকডাক বা শোডাউন ছাড়াই। যার সুবিধা পেয়ে আসছে গোটা দেশ। আর সেনাপ্রধানের এ সংক্রান্ত অবদান একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গেলবারের মতো এবারও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জেনারেল ওয়াকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষ যেন উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে-এ ব্যাপারে তার একটি কমিটমেন্ট রয়েছে। তা তিনি রক্ষা করে চলছেন।

সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের যে কারোই বোধগম্য, দেশ একটি জটিল-কঠিন সময় পার করছে। যে কোনো সময় যে কোনো অজুহাতে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা একটুও থামেনি। বরং নির্বাচন সামনে রেখে তা আরো বেড়েছে। তার আগে পূজা একটি উপলক্ষ্য হতে পারে। তা কারো কাছে ভাবগাম্ভীর্যের, কারো কাছে মতলব হাসিলের। নির্বাচনের আগে এটি সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি প্রিটেস্ট। এ প্রাক্করীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে। তাই পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থেই নয়, জাতীয় ঐক্য ও সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এমএএম