শিক্ষা কোটায় নজিরবিহীন জালিয়াতি, ১২৯৪ শিক্ষার্থীর একাদশে ভর্তি স্থগিত

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:০০

চলতি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য বরাদ্দকৃত ১ শতাংশ কোটায় (শিক্ষা কোটা-১) নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এই কোটার বিপরীতে কলেজে ভর্তিতে নির্বাচিত হয়েছে ২ হাজার ৭৭ জন শিক্ষার্থী। অথচ অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাত্র ৩০ জন সন্তান এবার এসএসসি পাশ করেছেন। এদিকে অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন আবেদনে শিক্ষা কোটা-২-এর ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সব কলেজ অধ্যক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা কোটা-২-এ নির্বাচিত ১ হাজার ২৯৪ জনের ভর্তি স্থগিত হলো।

গতকাল রবিবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১০ আগস্ট আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি কর্তৃক জারি করা ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন আবেদনে এডুকেশন কোটা-২ (ইকিউ-২) স্থগিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পাঠানো হয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষা কোটায় ভর্তিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্যাডারদের সন্তানদের জন্য নির্ধারিত কোটা ঘিরে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে। ভর্তির নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থা ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি স্কুল-কলেজ ও কার্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ১ শতাংশ কোটা (শিক্ষা কোটা-২) রাখা ছিল। তবে পৃথক কোটা হওয়া সত্ত্বেও অধীন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের অনেকেই শিক্ষা কোটা-১-এ আবেদন করে নির্বাচিত হয়েছে। পরে এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছিল। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এবার স্থগিত করা হয়েছে আগের সিদ্ধান্ত।

ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী, ৯৩ শতাংশ আসন মেধার ভিত্তিতে পূরণ হয়। বাকি ৭ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা বা শহিদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য।

জানা গেছে, শিক্ষার দুই কোটায় ইনসিওরেন্স কোম্পানির চাকরিজীবীর সন্তান থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের সন্তানরাও নির্বাচিত হয়েছেন। এই দুই কোটা ব্যবহার করে সুযোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরাও। ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা না থাকার পরও কোটার যথেচ্ছ ব্যবহার শিক্ষার্থী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বলছে, বর্তমান সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স ৬৭ বছর। এই বয়সে তার সন্তান থাকার সম্ভাবনা খুব কম। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজেদের স্বার্থে শিক্ষা কোটা কুক্ষিগত করে রেখেছে। আর এই দুই কোটার অপব্যবহারে প্রকৃত মেধাবীরা ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অভিভাবকরা বলেন, মেধা ও প্রতিযোগিতার জায়গায় কোটা থাকায় প্রকৃত যোগ্য অনেক শিক্ষার্থী বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তি হতে পারছে না অথচ কোটার কারণে কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীরা ভালো কলেজে সুযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে কোটার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বছরের নীতিমালায় মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোটা বন্ধে সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় এটি বহাল রেখেছে। যার ফলেই ভর্তি কার্যক্রমে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। যেহেতু এখন মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনি কোটা নেই, সে কারণে এসব কোটার যৌক্তিকতাও এখন নেই।

একাদশে ভর্তিতে শেষ ধাপে আবেদন শুরু, চলবে দুদিন :২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য শেষবারের মতো আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং যা চলবে আজ সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত। আবেদনের ফল প্রকাশ হবে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায়। এর আগে তিন ধাপে মোট ১০ লাখ ৬৬ হাজার ১৬৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় নির্বাচিত হয়েছে ১ হাজার ৫০৬ জন। অন্যদিকে শিক্ষা কোটায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৭১ জন। তাদের মধ্যে শিক্ষা কোটা-১-এ সুযোগ পেয়েছেন ২ হাজার ৭৭ জন এবং শিক্ষা কোটা-২-এ ১ হাজার ২৯৪ জন। এদিকে ৫ হাজার ২৪০ জন শিক্ষার্থী কোনো কলেজে ভর্তির সুযোগ পাননি। এর মধ্যে ২৯৫ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীও রয়েছেন। তাদের কথা বিবেচনা করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এই চতুর্থ ধাপের আবেদন শুরু করেছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফল প্রকাশের পর চতুর্থ ধাপের শিক্ষার্থীদের নির্বাচন নিশ্চায়ন করতে হবে। নিশ্চায়ন প্রক্রিয়া চলবে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত। কলেজে ভর্তি হতে হবে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এরপর আর কলেজে ভর্তির কোনো সুযোগ থাকবে না। শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত ভর্তির ওয়েবসাইটের www.xiclassadmission.gov.bd পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কলেজে বিদ্যমান আসনসংখ্যা দেখে সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজে আবেদন করতে হবে।

শেষ ধাপে অনলাইনে সেসব শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারবেন, যারা আগে তিন ধাপে আবেদন করেনি কিংবা আবেদন করে কলেজ সিলেকশন পায়নি। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থী চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছে, কিন্তু কোনো কারণে কলেজে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তি হতে পারেনি কিংবা নিশ্চায়ন করতে পারেনি; তারাও আবেদনের সুযোগ পাবেন।

 

ইত্তেফাক/এমএএম