জীবন্ত সম্পদ

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৭:৩২

মানুষের জীবনে বয়স শুধু একটি সংখ্যা নয়: এটি ঘরের গোলায় সোনালি ফসল রাখার মতো সময়ের দর্পণ, মূল্যবান কষ্টিপাথর, অভিজ্ঞতার ভান্ডার। প্রবীণরা সেই ভান্ডারের রক্ষক-যারা ইতিহাসের আলোয় দীপ্ত হয়ে নবীনদের সামনে পথ উন্মোচন করেন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সেই আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। নবীনরা প্রযুক্তির ঝলকানিতে ব্যস্ত হয়ে প্রবীণদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আর প্রবীণরা নিজেদেরকে পরিবারের বোঝা ভেবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন।

সক্রেটিস বলেন-'An unexamined life is not worth living।' প্রবীণদের জীবনই সেই পরীক্ষিত জীবন, যেখানে সঞ্চিত রয়েছে সংগ্রামের শিক্ষা আর ধৈর্যের মহিমা। আফ্রিকান প্রবাদে বলা আছে-When an elder dies, a library burns to the ground।' প্রবীণ হারানো মানে একেকটি গ্রন্থাগারের ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া। তাই নবীন প্রজন্ম যদি প্রবীণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতের পথে আলোহারা হয়ে পড়বে। হারাবে পথপ্রদর্শক।

আজ পরিবারকাঠামো ভেঙে পড়ছে, প্রবীণরা স্থান পাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে। অথচ সমাজবিজ্ঞান প্রমাণ করে-প্রবীণরা শুধু পরিবারের সদস্য নন, তারা সমাজের নৈতিক দিশারি। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, 'A nation's culture resides in the hearts and in the soul of its people।' প্রবীণদের জীবনই সেই হৃদয়, সেই আত্মা। নবীনরা যদি সেই হৃদয় থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তবে সমাজের বিভাজন কমবে, সহনশীলতা বাড়বে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবীণদের ভূমিকা হতে পারে সমঝোতার সেতুবন্ধ। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছরের কারাজীবনের পর প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমা ও ঐক্যের বার্তা দিয়ে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিলেন। আমাদের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও শিক্ষকেরাও নবীনদের শেখাতে পারেন-শর্টকাট পথ নয়, ধৈর্য ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের লক্ষ্যে ছুটে চলা।

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, 'In the middle of difficulty lies opportunity প্রবীণরা জানেন কীভাবে সীমিত সম্পদে টিকে থাকতে হয়। নবীন উদ্যোক্তারা যদি প্রবীণের কাছ থেকে শিখতে পারেন, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও তারা দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।

জাপানে প্রবীণদের বলা হয় 'living treasure' তথা জীবন্ত সম্পদ। চীনের কনফুসীয় দর্শনে প্রবীণদের পরিবার ও সমাজের ভিত্তি বলা হয়েছে। পাশ্চাত্যে প্রবীণরা নীতিনির্ধারণ ও শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশেও সময় এসেছে প্রবীণদেরকে অতীতের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখা উচিত।

প্রবীণ হলো নবীনের হৃদয়ের শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নবীন ও প্রবীণকে কেবল দুটি ভিন্ন পর্যায় হিসেবে দেখেননি, বরং জীবনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, নবীন ও প্রবীণ উভয়ই জীবনের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ধারক ও বাহক। 'ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা'-এই কবিতায় প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক দেখিয়েছেন। এখানে প্রবীণকে 'পরম পাকা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। কবির মূল বক্তব্য হলো, নবীন তারুণ্যের সঙ্গে প্রবীণের প্রজ্ঞা মিলেমিশে এক নতুন ও শক্তিশালী জীবন গড়ার ভিত্তি তৈরি করবে। এটাই হলো বর্তমান বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা। প্রবীণকে সম্মান, নবীনকে ভালোবাসা-এই দুইয়ের মিলনেই জাতি খুঁজে পাবে আলোকিত ভবিষ্যতের পথ।

কুরআন ও হাদিসে বলা হয়েছে যে, প্রবীণদের জ্ঞান এবং নবীনদের উদ্যম একত্র হলে সমাজের জন্য এটি একটি সমৃদ্ধির পথ তৈরি করে। আল্লাহ বলেন-আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্যপান করা ছাড়তে সময় লেগেছে ত্রিশ মাস (সুরা আখকাফ, ৪৬: ১৫)।' এই আয়াতে পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাদের জ্ঞানকে মূল্য দেওয়ার ব্যাপারে কুরআন খুবই স্পষ্ট। এ কথা সব প্রবীণের জন্যও প্রযোজ্য, তাদের অভিজ্ঞতা ও জীবনের পাঠ আমাদের জন্য অমূল্য।

‘তোমরা তাদের প্রতি 'উফ!' বোলো না এবং তাদেরকে তিরস্কার কোরো না, বরং তাদের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলো (সুরা ইসরা, ১৭:২৩)।’ এই আয়াত প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির নির্দেশ দেয়। হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেন-যারা নবীনদের প্রতি সহানুভূতি ও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখে, তারা ইসলামের প্রকৃত অনুসারী (তিরমিজি)।

কুরআন ও হাদিসে আমাদের শেখায় যে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সমাজে এক অমূল্য সম্পদ, যা নবীনদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। নবীনদের উদ্যম ও সৃজনশীলতা সমাজের অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নবীনদের উচিত প্রবীণদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের উদ্যমকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। এভাবে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং নবীনদের শক্তি যদি একত্র হয়, তাহলে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ সমাজ সৃষ্টি হতে পারে।

মোদ্দা কথা, প্রবীণরা আমাদের আলোকবর্তিকা, অভিজ্ঞতার দর্পণ। আজকের বাংলাদেশে সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনটনের মধ্যেও প্রবীণরা হতে পারেন আলোর দিশারি, নতুন পথের লাইট হাউস। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা নবীনদের পথ দেখাবে, মানবিকতা শেখাবে, মননশীলতায় আনবে দৃঢ়তা। আমাদের কল্পিত ভবিষ্যৎ সৃষ্টি হবে তখনই, যখন প্রবীণের প্রজা, মহিমা ও নবীনের শক্তি একসঙ্গে মিশে যাবে। প্রবীণদের যদি আমরা জাতির আলোকবর্তিকা হিসেবে মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ শুধু উন্নতই হবে না, বরং বিশ্বসভ্যতার সামনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক: সাংবাদিক, নির্বাহী পরিচালক, লোকাস-ক্রিয়েটিভ উইংস, ঢাকা

ইত্তেফাক/কেএইচ