লংগদু টু রাঙ্গামাটি ভায়া কাপ্তাই লেক

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:০২

সাজেক থেকে রাতের গাড়িতে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। সকালে রওনা না দিয়ে তাই বিকেল ৩টায় রওনা দিলাম। দিনের পরিধি ছোট হওয়ায় দিঘীনালায় আসতে আসতে সন্ধ্যা প্রায়। হঠাত্ মাথায় ভূত চেপে বসলো। খাগড়াছড়ি না হয়ে ভিন্নপথে ঢাকায় যাবো। দিঘীনালা থেকে লংগদু। লঞ্চ বা ট্রলারে কাপ্তাই লেকের নিষ্পাপ হাওয়ায় মন ভাসিয়ে রাঙ্গামাটি। যে ভাবনা সেই কাজ। রাতে দিঘীনালায় অবস্থান।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টিমলিডার শওকত ভাই, সিদ্দিক, কার্তিক বিশ্বাস, নেপাল পন্ডিত, জায়েদ মজুমদার ও আমি দিঘীনালা বাস স্টেশন থেকে অটোরিকশায় চড়ে সোজা লংগদুর পথে। দিঘিনালা থেকে লংগদুর জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা। সূর্য্যের উঁকি-ঝুঁকিতে পাহাড়ি জনপথ ক্রমশ তার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে চলছে অটোরিকশা। পাহাড়ে উঠতে গিয়ে গতি কিছুটা কমলেও নামার মুহূর্তে রোমাঞ্চকর অনুভূতি। হঠাত্ অটোরিকশা থেমে যায়। রাস্তাজুড়ে পাহাড়ি নারীদের আনাগোনা। অটোরিকশা চালককে প্রশ্ন করতেই সে বললো, এটা একটা বাজার। কী নাম? মনের মানুষের বাজার! অদ্ভত তো! পুরুষের পাশাপাশি এখানে নারীরাও ক্রেতা এবং বিক্রেতা। গাড়ি থেকে নেমে নিজেদের জড়িয়ে নিলাম ফ্রেমে। ফের গাড়ি চলছে, পেটেও ক্ষুধা নামক দানবটা অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

সকাল ৯টা ৩০ মিনিট। লংগদু ঘাটে গিয়ে সকলের মাঝে হতাশা। মাত্র ৫ মিনিট আগে মাইনীমুখ ঘাট থেকে আসা লঞ্চটি লংগদু ঘাট অতিক্রম করে চলে গেছে। কী করা যায়? ভাগ্য আমাদের অনুকূলে। আধঘণ্টা পর এখান থেকে একটি ট্রলার ছাড়া হবে। উদ্দেশ্য শুভলং বাজার হয়ে বরকল, তারপর রাঙ্গামাটি রিজার্ভ বাজার। পাহাড়ি জনপথে আমাদের চলাচলে কিছুটা নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। ট্রলারের নাবিকের কাছে গিয়ে অনেকটা স্বস্তি ফিরে পেলাম। তা না হলে পুনরায় দিঘীনালায় ফিরে আসতে হতো। এরইমাঝে নাস্তার আয়োজন। আমাদের ডাল বা আলুবাজির পরিবর্তে শাক-সবজি (আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় লাভরা)। পোয়ারুটি না বলে এটাকে ডালপুড়ি বলাই উচিত, যদিও পোয়ারুটির মতো, সাইজে ডালপুড়ির মতো।

যাক ট্রলার মাঝির ডাক, আমাদের কাপ্তাই লেক দর্শন। ঘুরতে এসেছি বলে ট্রলারের হেলপার ট্রলারের ওপরে টিনের ছাউনিতে বিশাল এক কাপড় বিছিয়ে দিয়েছে। শুভলং বাজারের উদ্দেশ্যে ট্রলার এগিয়ে যাচ্ছে। বিশাল লেকের মাঝ দিয়ে ট্রলার চলছে। দু-পাশে পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য আমাদের যতটা না আনন্দ দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আনন্দ দিচ্ছে স্বচ্ছ পানির চিকচিক মেলা। লেকজুড়ে মাছ ধরার ছাউনি, অনেকে মাছ ধরায় ব্যস্ত। পানকৌড়িরা একবার উড়ছে, আবার পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনো পানির গভীরে নিরুদেশ হচ্ছে। এখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি নির্দ্বিধায় আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে। হূদ-পাহাড়ের অকৃত্রিম সহাবস্থান আর কোথাও দেখা মেলেনি। স্বচ্ছ জলরাশি আর সবুজ পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের মন-প্রাণ জুড়িয়ে দিয়েছে প্রকৃতির আপন মহিমায়। প্রকৃতি এখানে কতটা অকৃপণ হাতে তার রূপসুধা ঢেলে দিয়েছে তা না দেখলে কখনো অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

 

 

লেকের মাঝে ছোট ছোট টিলায় বাড়িগুলো যেন শিল্পীর আঁকা কোনো প্রতিচ্ছবি। চলাচলের জন্য নৌকা বা ট্রলারই তাঁদের একমাত্র ভরসা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ট্রলার এসে পৌঁছায় শুভলং বাজার বা শুভলং আর্মি ক্যাম্পের সামনে। যাত্রী ওঠানামা শেষ করে বরকল ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যতটা এগিয়ে যাচ্ছে দু-পাশের পাহাড়ের দূরত্ব ততই কমে আসছে। মায়াবী এক জগত্। তপ্ত রৌদ্রের ক্লান্তি ছেড়ে হালকা শীতল হাওয়ায় শরীরের শিহরণ জাগিয়ে তুলেছে। পাহাড়ের ভেতরে যেন সরু রাস্তার আগমন। পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের কণা। ছোট ছোট অসংখ্য ঝরনাধারা। সত্যিই এই অপূর্ব দৃশ্যের কাছে শত বেদনা মিলিয়ে যায়। অনুভূতিতে আসে প্রশান্তি। এক সময় ক্যামেরায় ধরা দেয় শুভলং ঝরনা। পানিপ্রবাহ কিছুটা কম। তাই বলে কী! ক্লিক করা বন্ধ থাকে? না। বরকল ঘাট হয়ে ট্রলার যখন রাঙ্গামাটি বোর্ড বাজার এসে পৌঁছায় তখন প্রায় বিকেল ৩টা। ক্ষুধার জ্বালায় বাঁকা হয়ে যাওয়া মেরুদণ্ডটা সোজা করে বাস কাউন্টারে টিকেট কেটে আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।