রিজার্ভ বাড়ার একটি উপায় হলো আমদানি সংকুচিত করা। প্রকৃতপক্ষে কিছু সময়ে আমদানির শৃঙ্খল, বিশেষত অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় আমদানি কঠোর নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ রক্ষা করে অর্থনৈতিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, যা বৈদেশিক বাণিজ্য, ঋণপ্রাপ্যতা এবং মুদ্রানীতি পরিচালনার ক্ষমতা নির্ধারণে এটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। গত এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত রিজার্ভে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি দেখা গেছে; একই সঙ্গে আইএমএফ-BPM6 পদ্ধতিতে গণনায়ও রিজার্ভের স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা, সোনার মজুত ও আন্তর্জাতিক রিজার্ভ, যেসব ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিকে ঢেউয়ের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে ব্যবহার করা যায়। এই বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দেশীয় হিসাবের ভিত্তি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (আইএমএফ-BPM6) গণনা করলে কিছুটা ভিন্নতা দেখা দেয়। জুলাই-২০২৫-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক রিপোর্ট অনুযায়ী মোট রিজার্ভপ্রায় ২৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং BPM6 অনুযায়ী প্রায় ২৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন হয়েছে। বছরের সেপ্টেম্বর গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
গত সরকারের শেষ সময়ে রিজার্ভ বেশ খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল। নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আমদানি ও বিনিয়োগে চাপ পড়ে। কিছু আমদানি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে রিজার্ভ রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি ব্যবস্থাপনা মিলে কিস্তিভিত্তিক বকেয়া পরিশোধ, পাওনা পরিশোধ ও হুন্ডি কমিয়ে এবং পাচারকারীদের মোকাবিলা করে মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা আনার কাজ শুরু করে; সেই প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির এক শক্ত ভিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে ২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে। এই রিপোর্ট বলছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা অতীত রেকর্ড থেকে বেশি এবং গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্ট রেমিট্যান্সে তীব্র ঘাটতি দেখা না দিয়ে বরং প্রায় ২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন এবং আগস্টও উচ্চপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির বেশ কিছু কারণের মধ্যে অন্যতম, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়াসহ ট্রেড-লেবার মার্কেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা, নতুন মাইগ্র্যান্ট ভিসা অনুমোদন ও সরকারি অনুপ্রেরণা এবং অনলাইন ও আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স চ্যানেলকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যাংকিং প্রণোদনা অন্যতম। রেমিট্যান্স সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে ঢুকলে তা রিজার্ভে যোগ করাও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা যায়।
এফডিআই সরাসরি রিজার্ভ বৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি নয়, তবে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাপ্রবাহ ও বিনিয়োগ-পরিবেশে আস্থা বাড়ায়। গত কয়েক বছর ধরে এফডিআই প্রবাহ কিছুটা কমে গিয়েছিল। বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে নেট এফডিআই ছিল প্রায় ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-এর এফডিআইয়ের তুলনায় কিছুটা হ্রাস। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-এর প্রথম ত্রৈমাসিক তথ্য অনুযায়ী নেট এফডিআই এসেছে ৮৬৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
রিজার্ভ বাড়ার একটি উপায় হলো আমদানি সংকুচিত করা। প্রকৃতপক্ষে কিছু সময়ে আমদানির শৃঙ্খল, বিশেষত অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় আমদানি কঠোর নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ রক্ষা করে। গত বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিশ্ব পণ্য সরবরাহকারীদের কিছু বিল বকেয়া রেখে বা কিস্তিতে পরিশোধ করে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, পাশাপাশি হুন্ডি-চ্যানেল কমানোর উদ্যোগ, আকুর বিল পরিশোধের পরিমাণ রিজার্ভে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তবে এগুলো অস্থায়ী নীতি-উপায় হিসেবে কাজ করে। সুতরাং দীর্ঘ মেয়াদে বরাবরের মতোই রপ্তানি ও রেমিট্যান্সেই স্থায়িত্ব আনা জরুরি।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলারে, যা মোট অর্থনীতির চাহিদার তুলনায় কম নয়। তবে নীতিগত কারণে কিছু সময়ে আমদানির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, যেমন হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ ও ঋণসংকটের প্রভাবে কিছু মাসে মূলধনী ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি সীমিত হয়েছিল। অর্থাৎ, রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে এককভাবে আমদানি কমানোর ভূমিকা নেই; বরং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিই এখানে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিতে দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইটি দিকই রয়েছে। ইতিবাচকভাবে, রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে, টাকার ওপর চাপ কমেছে এবং প্রায় পাঁচ মাসের আমদানির খরচ মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা বাড়ছে। তবে আশঙ্কাও আছে। রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি রেমিট্যান্স ও পোশাক রপ্তানির মতো সীমিত উৎসে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক মন্দা, বাজার সংকোচন বা শ্রমবাজারে ধাক্কা এলে প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়তে পারে। একইভাবে, দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিকে কৃত্রিমভাবে সীমিত করা হলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করবে।
কখনো কখনো দেশের রিজার্ভের স্তরে বিদেশি সাহায্য, যেমন আইএমএফ বা অন্যান্য বহুজাতিক ঋণ বা অনুদান সংযুক্ত হলে তা রিজার্ভ বাড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে সরকার বকেয়া বিল মেটাতে ঋণ নিয়ে রিজার্ভ সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। বাংলাদেশ অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বকেয়া ঋণ মিটিয়েছে, তার পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। তবে উল্লেখ্য, ঋণভিত্তিক রিজার্ভবাড়ানো টেকসই নয়, যদি তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়।
মোদ্দা কথা, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় এই দুইটি একযোগে রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রধান চালক হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে এফডিআইয়ের অবদান তুলনামূলকভাবে ছোট কিন্তু উন্নয়নমুখী। সাম্প্রতিক রিজার্ভ বৃদ্ধি মূলত রেমিট্যান্সের দ্রুত বৃদ্ধি, রপ্তানি-উপার্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং একই সময়ে, নীতিগত উদ্যোগ ও সরকারি বকেয়া পরিশোধও সহায়ক ভূমিকা রেখেছে; কেবল আমদানি বা বিনিয়োগ কমিয়ে নয়।
সরকার যদি দ্রুত রিজার্ভ বাড়িয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় আর সেটি যদি বিনিয়োগ কমিয়ে করে থাকে, তাহলে এর ফলস্বরূপ বেশ
কিছু নেতিবাচক ধারা দেখা দিতে পারে; যেমন-সড়ক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও জলসেচ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কনস্ট্রাকশন ও সরকারি প্রকল্পগুলো যে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে আয় বাড়ায়, তা কমলে চাহিদা-সংকোচনে স্থায়ীভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমতে পারে; বড়-ছোট প্রকল্পগুলোতে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে এবং এটি দূরবর্তীভাবে ভোক্তা-চাহিদা ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে; উৎপাদনশীল বিনিয়োগ না করলে বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগদাতাদের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়তে পারে-ফলে এফডিআই ও প্রাইভেট ও সরকারি ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে; অবকাঠামোগত ব্যয়ের ধীরতায় উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে, ফলে রপ্তানি-পণ্য কম প্রতিযোগী হবে; দরিদ্র ও মাঝারি শ্রেণির ওপর আগামী দিনে চাপ পড়লে সামাজিক নিরাপত্তা চাহিদা বাড়বে-এতে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ব্যয় আরো বাড়তে পারে। স্বল্প মেয়াদে রিজার্ভ বাড়ালে অর্থনৈতিক শক প্রতিহত করার সামর্থ্য বাড়ে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কাটা হলে দেশের প্রবৃদ্ধি ও আয়-উৎপাদন কমে যেতে পারে, ফলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি-ধারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কেবল রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ কাটা টেকসই নীতি নয়।
সুতরাং, রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য ও আর্থিক বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ডিজিটাল রেমিট্যান্স ইনসেনটিভ, কনভিনিয়েন্স-ফি কমানো ও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনতে প্রণোদনা; একই সঙ্গে হুন্ডি-চালানি কঠোরতার ব্যবস্থা নিতে হবে। আরএমজির পর নির্ভরতা কমিয়ে জুতা, চামড়া, সামুদ্রিক খাদ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক রপ্তানি বৃদ্ধি বাড়াতে নীতিগত সহায়তা। স্পেশাল-ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ-এক্সপিডিশন; রাজস্ব ও ট্যাক্স রিবেট প্রবর্তন; ও ল্যান্ড এবং ইনফ্রা-প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনপ্রবাহ বাড়াতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
