জীবন সায়াহ্নের গোধূলিতেও তারা সম্পদ

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৫, ০০:৪৬

জরা বা বার্ধক্য জীবনের এক চরম সত্য। শৈশবে সোনালি সকাল শেষ করে তারুণ্য আর যৌবনের রোদেলা দুপুর পাড়ি দিয়ে মাঝ বয়সের ব্যস্ত বিকালটাও যখন চলে যায়, তখনই জীবন সায়াহ্নের গোধূলি বেলায় নেমে আসে বার্ধক্য। এটিই মানব জীবনের শেষ অধ্যায়। অকাল মৃত্যু না হলে এই স্তরটিতে শেষ পর্যন্ত পদার্পণ করতেই হবে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য সাধারণ এই চারটি পর্ব নিয়ে একজন মানুষের জীবন।

শরীরে যতক্ষণ শক্তি থাকে মানুষ কখনো মনে করে না সে একদিন প্রবীণ হবে। কিন্তু প্রকৃতির টানে একদিন প্রবীণ হতেই হয়। এটা জীবন পরিক্রমা। সব প্রাণেরই তাই। ভারতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, 'আজ হয়তো তুমি শক্তিশালী কিন্তু সময় তোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। কারণ কালস্রোতে তুমি একদিন শক্তিহারা-রোগে কাতর একজন প্রবীণ।' তাই কোনো অবস্থাতেই প্রবীণদের অবহেলা করা মোটেই সমীচীন নয়। তাদের মনে বা শারীরিক কষ্ট না দেওয়া কর্তব্য। প্রবীণ মানে সেকেলে, অথর্ব, অক্ষম এবং সংসারের বোঝা নয়; বরং তারাই আজকের দিন গড়ার কারিগর। একটা পারিবারের গার্ডিয়ান হিসেবে বটবৃক্ষ। তাদের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা সদা প্রাসঙ্গিক অথচ কোনো কোনো পরিবারে চরম অবহেলার পাত্র। বর্তমান সময়ে প্রবীণদের মধ্যে একাকিত্বের সমস্যা প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে। শিল্পী নচিকেতার গানে সমাজের এই ক্ষত উঠে এসেছে 'ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার/ নানারকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী/ সব চেয়ে কম দামী একমাত্র আমি/' সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে প্রবীণরা আজ অরক্ষিত, অসহায়, বিচ্ছিন্ন। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজের পুত্র কামবক্সকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, 'আজ আমার জীবনের উজ্জ্বল দিনগুলো চলে গেছে। আছে শুধু অস্থি চর্ম আর কঙ্কাল।'

প্রবীণরা কর্মস্থলে, বাজারে, বিনোদনস্থলে পেনশন তোলার সময় সর্বত্রই অনাহুত, উপেক্ষিত। কিন্তু সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে আমাদের দেশে এখনো তারা যথার্থ মর্যাদা পান না। একথা ভুললে চলবে কেন যে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে রয়েছে তাদের অমূল্য অবদান! তাদের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও কর্মসহায়তা সব সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশে আর্থিক ও সামাজিক কারণে বর্তমানে দিনদিন দূরত্ব বেড়ে চলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার তৈরি হয়েছে। এতে আমাদের ঐতিহ্যগত সমাজব্যবস্থা কিছুটা ভেঙে পড়েছে। এটা গুণগত না সামাজিক পরিবর্তন সেটা ভাববার বিষয়। প্রবীণদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং নবীনদের সৃষ্টিশীল বিজ্ঞানমনস্ক দক্ষতা সমন্বিত হলেই কেবল একটি সমাজ বা রাষ্ট্র আগাতে পারবে। কাজেই প্রবীণদের বোঝা মনে করার কোনো কারণ নেই।

সমাজবিজ্ঞান প্রমাণ করে-প্রবীণরা শুধু পরিবারের সদস্য নন, তারা সমাজের নৈতিক দিশারি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবীণদের ভূমিকা হতে পারে সমঝোতার সেতুবন্ধ। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছরের কারাজীবনের পর প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমা ও ঐক্যের বার্তা দিয়ে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিলেন। আমাদের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ও শিক্ষকেরাও নবীনদের শেখাতে পারেন-শর্টকাট পথ নয়, ধৈর্য ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের সফলতা। প্রবীণরা জানেন, কীভাবে সীমিত সম্পদে টিকে থাকতে হয়। নবীন উদ্যোক্তারা যদি প্রবীণের কাছ থেকে শিখতে পারেন, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও তারা দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।

কনফুসীয় দর্শনে প্রবীণদের পরিবার ও সমাজের ভিত্তি বলা হয়েছে। পাশ্চাত্যে প্রবীণরা নীতিনির্ধারণ ও শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশেও সময় এসেছে প্রবীণদের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখার।

জাপানে প্রবীণদের বলা হয় 'living treasure' তথা জীবন্ত সম্পদ। জাপানে প্রবীণদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও উন্নত জীবনশৈলীর সঙ্গে অভ্যস্ত করানোর চেষ্টা হচ্ছে। এজন্য প্রবীণদের তৈলাক্ত আমিষ খাদ্যের পরিবর্তে বলা হচ্ছে ফল, সবজি, মাছ, সামুদ্রিক ছত্রাক ও সয়াবিন খেতে। এর জেরে প্রবীণদের হৃদযন্ত্র সংক্রান্ত সমস্যা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে গেছে। প্রবীণদের চিকিৎসাসংক্রান্ত খরচ বহন করছে সরকার। এছাড়া তাদের খাবার পরিবেশনে, পার্কে ও জিমে সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ রোবট। প্রবীণরাও দেশের অর্থনীতিতে সাহায্য করতে পারে ভ্রমণ, বিনোদন ও খাদ্যপণ্যের জন্য অর্থ খরচ করে। সে দেশে প্রবীণরা পরিবারে, কর্মস্থলে যথেষ্ট সম্মান ও প্রাধান্য পান। তারা একা একাই বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেন এবং প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সোমবারটিকে প্রবীণরা 'প্রবীণ দিবস' হিসেবে পালন করেন।

১৯৭৪ সালে বুখারেস্টে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব জনসংখ্যা সম্মেলনে স্বীকার করা হয়েছে যে, 'বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার দুটো বিষয়ই তাৎপর্যপূর্ণ, জনবিস্ফোরণ এবং বার্ধক্য-যা ধীর গতিতে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বার্ধক্য জনসংখ্যার ভয়াবহতা বিবেচনায় এনে বিশ্বব্যাপী প্রবীণ বিষয়ক নীতি, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে Vienna International Plan of Action on Ageing (VIPAA) গৃহীত হয়, যা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কর্তৃক অনুমোদিত হয়। জাতিসংঘ বার্ধক্যকে মানবজীবনের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে এ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালন করে আসছে। ২০২২ সালে আদম শুমারিতে দেখা যায়, ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব জনসংখ্যা ৯.৭ মিলিয়ন, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৫.৮৯ শতাংশ। প্রবীণ জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। প্রবীণ জনসংখ্যা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে। 

সম্প্রতি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শিশু বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে, মোট প্রবীণ জনসংখ্যা শিশু জনসংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং, এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রবীণরাই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হবে। এ পরিবর্তনের নীরব শিকার হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। এদেশের শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ লোক গ্রামে বসবাস করে। আর্থ-সামাজিক সমস্যা নিরূপণ করলে দেখা যায়, দেশের ৫৫ শতাংশের অধিক প্রবীণ দারিদ্র্যসীমার নিচে গ্রামে বাস করে। এই ব্যাপক দারিদ্র্যের মধ্যে অধিকাংশ প্রবীণ স্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার শিকার হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবারেই সন্তানরা পিতামাতাকে বিষয় সম্পত্তির মতো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকে, কিন্তু চিকিৎসাসহ মৌলিক সেবা থেকে প্রবীণরা বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থায় সমাজের বাড়তি বোঝা হিসেবে বিবেচিত প্রবীণ ব্যক্তি চরম হতাশা ও হীনম্মন্যতায় ভোগেন। শহুরে বসবাসরত প্রবীণরা স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা কিছুটা ভোগ করলেও গ্রামে তা একেবারেই অনুপস্থিত। তাদের পেশাগত সেবাদান আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো গড়ে ওঠেনি। প্রবীণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও পেলিয়াটিভসেবা দরকার। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা তেমন সচেতন নই।

সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের নিশ্চিতের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে ও ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ 'Left no one behind.' এ প্রতিশ্রুতি পূরণ করার জন্য বয়স্ক জনসংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অপরিহার্য।

সরকার বয়স্ক ব্যক্তিদের সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় বয়স্ক ভাতা প্রদানসহ জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ এবং পিতামাতা ভরণপোষণ আইন ২০১৩ প্রণয়ন করেছে, যা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

সক্রেটিস বলেছেন, 'An unexamined life is not worth living।' প্রবীণদের জীবনই সেই পরীক্ষিত জীবন, যেখানে সঞ্চিত রয়েছে সংগ্রামের শিক্ষা আর ধৈর্যের মহিমা। আফ্রিকান প্রবাদে আছে-When an elder dies, a library bums to the ground।' প্রবীণ হারানো মানে একেকটি গ্রন্থাগারের ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া। তাই নবীন প্রজন্ম যদি প্রবীণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতের পথে আলোহারা হয়ে পড়ে। আজকের যারা নবীন, তারাই আগামীর প্রবীণ। এ অমোঘ সত্য ও বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার দৃপ্ত শপথ নেওয়ার এইতো সময়।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এমএএম