বিদ্যুতের ভেলকিতে বিপর্যস্ত হাওরদ্বীপ খালিয়াজুরী

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৫, ১৪:৪৯

‘কি আজব জায়গা খালিয়াজুরীতে ২৪ ঘণ্টার মাঝে বিদ্যুৎ থাকে না ২ ঘণ্টাও’— সম্প্রতি নিজের ফেসবুক ওয়ালে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সৈয়দা শিমু (Syeda Shimu) নামে স্থানীয় এক শিক্ষিকা। এলাকাবাসী বলছেন, নেত্রকোনার এ হাওরদ্বীপের বাসিন্দারারা সম্প্রতি ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।

তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে অনেকটাই স্থবিরতা নেমে এসেছে দৈনন্দিন কাজে।

এই পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর অভিযোগ, নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিদ্যুৎ সরবরাহের অব্যবস্থাপনার কারণেই তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।

তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে স্থবিরতা নেমে এসেছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা, চিকিৎসা, অফিস আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র। এমনকি ওষুধ সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রভাব।হাসপাতালের রোগীরা পড়ছেন বিপাকে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই খালিয়াজুরীতে অতিরিক্ত লোডশেডিং চলছে। সম্প্রতি এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

খালিয়াজুরী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মেহেরিন আক্তার বলেনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শহরের শিক্ষার্থীরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে। আর আমরা প্রতিদিন ধুঁকছি ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে। পড়াশোনায় আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইনে ক্লাস করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া যাচ্ছে না।’ 

শিক্ষার্থীদের মতো শিক্ষকরাও মনে করছেন দীর্ঘদিন ধরে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে পড়ালেখায়। খালিয়াজুরী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, গত জুলাইয়ে প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিদ্যালয়ের পাশের হার ছিল মাত্র ২৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। বিদ্যুতের সংকটের শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। 

শুধু শিক্ষার্থীরা নয়। ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের মুখে দুর্ভোগে পড়েছেন বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রোগী-চিকিৎসকরাও।

খালিয়াজুরী বাজারের ব্যবসায়ী সোহান বিন নবাব ও সেলিম মিয়া বলেন, ‘মাত্রা অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জীবন রক্ষাকারী ওষুধসহ অনেক মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আরেফিন আযিম বলেন, বেশিরভাগ সময়ই খালিয়াজুরীতে বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে জটিল অনেক রোগীকেই চিকিৎসা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া, গরমের দিনগুলোতে বিদ্যুতের অভাবে শিশু এবং উচ্চ-রক্তচাপের রোগীসহ সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি বেড়েছে। 

এদিকে, নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির খালিয়াজুরী সাব-জোনাল অফিসের এজিএম জিল্লুর রহমান জানান, খালিয়াজুরীতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে ৮-৯ ঘণ্টার জন্য। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত করা হয় মদন পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিস থেকে। 

মদন জোনাল অফিসের ডি জি এম মো. রফিকুল ইসলাম জানান, মদন ও খালিয়াজুরী উপজেলার ৬টি ফিডার চালু করতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় প্রায় ১৪ মেগাওয়াট। কিন্তু সপ্তাহ খানেক ধরে এখানে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণেই ইদানিং লোডশেডিং কিছুটা বেশি হচ্ছে। এ সমস্যা বিদ্যুৎ অফিসের অব্যবস্থার কারণে নয়। 

তিনি আরও বলেন, খালিয়াজুরীর জন্য বিদ্যুতের যে ফিডারটি রয়েছে সেটি চালু করলে সাড়ে তিন মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। বর্তমান বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতি এবং নেত্রকোনা গ্রিড থেকে সরবরাহের অবস্থা অনুযায়ী এ প্রয়োজন মেটাতে মদন উপজেলার ৪টি ফিডার বন্ধ রাখতে হয়। তবুও বিদ্যুৎ ঘাটতির এ সময়ে খালিয়াজুরীতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮-৯ ঘন্টা বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাদির হোসেন শামীম জানান, খালিয়াজুরীতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। শহরাঞ্চলে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎতের অভাব কিছুটা পূরণ করতে পারলেও এখানকার সাধারণ মানুষর পক্ষে সেটা প্রায় অসম্ভব। তাই এখানকার এ সমস্যা সমাধানের জন্য বিষয়টি নিয়ে জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় আলোচনা করা হবে। 

ইত্তেফাক/এপি