নিকিতা ক্রুশচেভ ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সেক্রেটারি (১৯৫৩-১৯৬৪)। তিনি ছিলেন কাউন্সিল অব মিনিস্টারস-এর চেয়ারম্যানও (১৯৫৮-১৯৬৪)। তাহার একটি বিখ্যাত উক্তি রহিয়াছে: Politicians are the same all over. They promise to build bridges even where there are no rivers, যেহেতু তাহার এই কথায় ছন্দ আছে, তাই ইহার অনুবাদ করা যাইতে পারে এইভাবে: রাজনীতিবিদরা সকলেই সমান/পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্ত অবধি ।/ তারা প্রতিশ্রুতি দেন সেতু নির্মাণের/এমনকি যেথায় নেই কোনো নদী।
নদীর অস্তিত্ব যেইখানে নাই, সেইখানে ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি কেন দেওয়া হইবে? জাতীয় অর্থনীতির অবস্থা যেইখানে সংকটাপন্ন, সেইখানে সেইসব দেশের নেতারা এতো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার হিম্মত কোথা হইতে লাভ করেন?
বাস্তবতা হইল, উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতিবিদগণ প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন। নির্বাচনের আগে এমন সব প্রতিশ্রুতি দেন যাহা শুনিয়া সচেতন নাগরিকদের আক্কেল গুডুম হইয়া যায়। অথচ তাহা বাস্তবায়ন করিবার ক্ষমতা বা সক্ষমতাই তাহাদের নাই। তাহার পরও তাহাদের মুখে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি না ঝরাইলে চলে না, রাজনীতি করা যায় না। কেননা পরবর্তীতে তাহাদের ইহা লইয়া তেমন কেহ প্রশ্ন উত্থাপন করেন না। এইসব দেশে এই ব্যাপারে সচেতন নাগরিকের সংখ্যাও হাতেগনা। ফলে প্রতিশ্রুতির রাজনীতি এইসব দেশে দিব্যি বহাল রহিয়াছে। আমরা মনে করি, রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। নির্বাচনী ইশতেহার রাজনীতিবিদদের বড় প্রতিশ্রুতি। উন্নত দেশের রাজনীতিবিদরাও এমন প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তাহারা যখন তখন ও কথায়-কথায় এমন অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেন না যাহা বাস্তবায়ন অযোগ্য বা হাস্যকর। কেননা এইসব দেশে প্রতিশ্রুতি দিলে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে হয়। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হইলে রাজনীতিবিদগণকে কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁহাদের পদও হারাইতে হয়। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সরকার জনগণের নিকট কৈফিয়ত দিতে বাধ্য।
তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহেও এমন অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ রাজনীতিবিদ রহিয়াছেন যাহারা উঠিতে-বসিতে প্রতিশ্রুতি দেন না। দিলেও অগ্র-পশ্চাৎ চিন্তা-ভাবনা করিয়া দেন। ক্ষমতায় থাকাকালে তাহা রক্ষা করিবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। পাঁচ বৎসর একটি সরকার থাকিলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। এইজন্য দরকার আন্তরিকতা ও জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা। তাহাছাড়া অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করিতে গিয়া অর্থনৈতিক অবমানের ঘটনা ঘটিতে পারে। বাংলায় 'গরীবের ঘোড়া রোগ' কথাটি এমনিতেই চালু হয় নাই।
অতএব, ক্ষমতায় যাহারা থাকেন তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো যাইবে না। তাহারা যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসেন, তাই যাহা করিবার এই সময়ের মধ্যে করিতে হইবে। এইজন্য লোক দেখানো উন্নয়নের দরকার নাই। অযথা বাহবা কুড়ানোরও প্রয়োজন নাই। তাই উন্নয়নশীল বিশ্বের নাগরিকদের উচিত রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির ফাঁদ হইতে বাহির হইয়া আসা। আর প্রতিশ্রুতি প্রদানের সময় রাজনীতিবিদের মনে রাখিতে হইবে, প্রত্যেকটি প্রতিশ্রুতির একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে। শুধু ভোট পাইবার জন্য অবাস্তব প্রতিশ্রুতির বন্যা বহাইয়া দেওয়া কেবল দায়িত্বহীনতাই নহে, ইহা একপ্রকার প্রতারণা।
এইজন্য যাহা করিতে হইবে তাহা সুচিন্তিত পরিকল্পনা এবং দেশের আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে করা বিধেয়। অর্থব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা এবং অপচয়-অপব্যয় ও দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করিয়া জনকল্যাণ নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। বিশেষত দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয় ও লোক-দেখানো প্রকল্পে অর্থ অপচয় না করিয়া অগ্রাধিকারভিত্তিক জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যয় করিলে দেশের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
